নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতার একুশে পদক প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এই অর্জনের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একটি বিব্রতকর প্রশ্ন—এত দীর্ঘ সময় পর কেন?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ববিতা কেবল একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নন; তিনি একটি সময়, একটি রুচি ও একটি নান্দনিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। ষাটের দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে ওঠা চলচ্চিত্রগুলোতে তার অভিনয় গভীর ছাপ রেখে গেছে। তবুও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় সারাজীবন।
বাংলাদেশে গুণী শিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রায়ই সময়নির্ভর নয়, বরং পরিস্থিতিনির্ভর হয়ে ওঠে। জীবনের মধ্যগগনে থাকা শিল্পীদের কাজের মূল্যায়নের বদলে আমরা তাদের স্মরণ করি অনেক সময় প্রান্তিক হয়ে পড়ার পর। ববিতার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
১৯৬৮ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করে জহির রায়হানের হাত ধরে ‘ববিতা’ নামেই চলচ্চিত্রাঙ্গনে স্থায়ী পরিচিতি লাভ করেন তিনি। ‘নয়নমনি’, ‘লাঠিয়াল’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’সহ অসংখ্য ছবিতে তিনি নারী চরিত্রকে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। টানা তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এই অভিনেত্রী বাংলা চলচ্চিত্রে গ্ল্যামার ও অভিনয় দক্ষতার বিরল সমন্বয় তৈরি করেছিলেন।
সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে অনঙ্গ বউ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ববিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। উপমহাদেশের অগণিত অভিনেত্রীর মধ্য থেকে তার নির্বাচন ছিল ববিতার অভিনয়ের গভীরতা ও সংযমের স্বীকৃতি। তবু সেই আন্তর্জাতিক অর্জন রাষ্ট্রীয় সম্মানের তালিকায় দীর্ঘদিন গুরুত্ব পায়নি।
ববিতা কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেননি। তিনি নীরবে, নিয়মিত কাজ করে গেছেন। সম্ভবত এই নীরবতাই তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দৌড়ে পিছিয়ে রেখেছে। আমাদের বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, যারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন বা ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করেন, তারাই আগে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান।
একুশে পদক অবশ্যই ববিতার প্রাপ্য ছিল। তবে এই সম্মান যদি অনেক আগেই দেওয়া হতো, তাহলে তা শুধু একজন শিল্পীর নয়, পুরো চলচ্চিত্র শিল্পের জন্যই সম্মানের হতো। দেরিতে দেওয়া এই স্বীকৃতি আমাদের রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক নীতির সীমাবদ্ধতাই সামনে এনে দেয়।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু স্মৃতিসৌধ বা পুরস্কারের তালিকায় নয়; বরং জীবিত শিল্পীদের কাজকে সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার মধ্যেই তার প্রকৃত সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা প্রকাশ পায়। ববিতার একুশে পদক প্রাপ্তি সেই দায়িত্বের কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল—একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিল দেরিতে জাগা রাষ্ট্রীয় বিবেকের কথাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts