নিউজ প্রবাসী ডেক্স :

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে অন্তত ১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
আন্তর্জাতিক বন্দর ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্তত ছয়টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার সকালে পারস্য উপসাগরে চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ উড়ে আসা বিস্ফোরক বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এছাড়া বুধবার রাতে ইরাকের জলসীমায় দুটি জ্বালানিবাহী তেল ট্যাংকারে বিস্ফোরক বোঝাই ছোট নৌকা দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে ট্যাংকার দুটিতে আগুন ধরে যায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ যেসব জাহাজে হামলা হয়েছে সেগুলোর পরিচালনা বা মালিকানার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পারস্য উপসাগর থেকে এই প্রণালি হয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই পথ প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর কাছে ‘এক লিটার তেলও’ সরবরাহ করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি করে তবে দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ইরানের নৌবাহিনী ইতোমধ্যে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বুধবার গভীর রাতে ইরাকের কাছাকাছি পারস্য উপসাগরে যেসব ট্যাংকারে হামলা হয়েছে তার একটি মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী ‘সাফেসিয়া বিঞ্চু’ এবং অন্যটি মাল্টার পতাকাবাহী ‘জেফিরোস’।
ইরাকি বন্দর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্যাংকার দুটি ইরাক থেকে জ্বালানি পণ্য বোঝাই করে যাত্রা করেছিল এবং ইরাকের জলসীমার মধ্যেই হামলার শিকার হয়।
হামলার পর নিরাপত্তার কারণে ইরাকের তেল বন্দরগুলোর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে বাণিজ্যিক বন্দরগুলো সীমিত আকারে চালু রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা।
ইরাকের বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি উদ্ধারকারী নৌকা পাঠিয়ে দুই ট্যাংকার থেকে ২৫ জন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কয়েকজন নাবিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
একজন বন্দর নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পানির ভেতর থেকে এক বিদেশি নাবিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
‘সাফেসিয়া বিঞ্চু’ ট্যাংকারটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সাফেসিয়া গ্রুপের মালিকানাধীন। অন্যদিকে ‘জেফিরোস’ ট্যাংকারটির পরিচালনা ও মালিকানার সঙ্গে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিগনাস ট্যাংকার লিমিটেড এবং গ্রিসের একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে।
এই ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে একই দিনে হরমুজ প্রণালির আশপাশে আরও তিনটি পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর বৃহস্পতিবার ভোরে আরও একটি জাহাজ হামলার শিকার হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকলে তা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts