
মাসুম বিল্লাহ ॥
১৩৮ বছরের দীর্ঘ ঐতিহ্য বহনকারী ইছালী দরবার শরীফের ওরশ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক মেলা এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। অজানা ও অনিবার্য কারণের প্রেক্ষিতে মেলা ও প্রসাধনীর দোকান ছাড়াই সম্পূর্ণ অনাড়ম্বরভাবে পালিত হচ্ছে পবিত্র ওরশ মাহফিল। তবে আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দরবার প্রাঙ্গণে চলবে জিকির-আজগার, ধ্যান ও নকশাবন্দী তরিকাভিত্তিক সাধনা।
বিশ্বখ্যাত শাহেন শাহা তরিকাতের নকশাবন্দীর উত্তরসূরি ও কর্মমুখর শাখা ইছালী সিলসিলার ইমাম, পীরে কামেল মোকাম্মেল শহ সূফী হযরত মাওলানা চাঁদশাহ আউলিয়া (রহ.)-এর ১৩৮ তম ওফাত দিবস উপলক্ষে পবিত্র ওরশ মাহফিল শুরু হয়েছে বাংলা ২২ মাঘ, বুধবার। এই মাহফিল চলবে আগামী ২৯ মাঘ পর্যন্ত।
দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ওরশকে কেন্দ্র করে ইছালী ও আশপাশের এলাকায় যে বিশাল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল, তা এবছর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত হাজারো ভক্ত-মুরিদ, আশেকান ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকত দরবার শরীফ ও তার আশপাশের এলাকা। কিন্তু এবছর কোনো ধরনের মেলা, নাগরদোলা কিংবা প্রসাধনীর দোকান বসছে না।
দরবার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ‘তৌহিদি জনতা’ নামক একটি অজ্ঞাত ও বিতর্কিত গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকির কারণে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেকোনো সময় ওরশের কার্যক্রমে হামলার আশঙ্কায় দরবার কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। এ কারণেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে বড় আয়োজন থেকে সরে এসে সীমিত পরিসরে ওরশ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে মেলা বন্ধ থাকলেও পীর বাড়িতে নকশাবন্দী তরিকাভুক্ত আধ্যাত্মিক সাধনা অব্যাহত রয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী জিকির-আজগার, ধ্যান, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভক্ত-মুরিদদের উদ্দেশ্যে তরিকাভিত্তিক বয়ান ও নসিহত প্রদান করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ইছালী সওয়াব সিলসিলার ইমাম ও দরবারে আউলিয়া শরীফের প্রতিষ্ঠাতা পীরে কামেল মোকাম্মেল হযরত মাওলানা বাসারাত উল্লাহ ওরফে চাঁদশাহ আউলিয়া (রহ.) বাংলা ১২২৩ সাল ও ইংরেজি ১৮৩০ সালে যশোরের বাঘারপাড়া থানাধীন শেখেরবাতান গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন সুফী শালেহ উদ্দীন (রহ.)।
পরবর্তীতে তিনি যশোর সদরের ইছালী-পাঁচবাড়িয়া গ্রামে শ্বশুরালয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানেই জিকির-আজগার ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমজ্জিত হন। তাঁর ইলম, তাকওয়া ও সুফিয়ানার কারণে অল্প সময়েই অসংখ্য ভক্ত ও মুরিদ তাঁর সান্নিধ্যে আকৃষ্ট হন।
পীরে কামেল মোকাম্মেল শহ সূফী হযরত মাওলানা চাঁদশাহ আউলিয়া (রহ.) বাংলা ২২ মাঘ ১২৯৬ সাল ও ইংরেজি ৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৯ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওফাতের পর থেকেই তাঁর বংশধর ও খেলাফতপ্রাপ্ত উত্তরসূরিরা প্রতি বছর বাংলা ২২ মাঘ থেকে সাত দিনব্যাপী ওরশ মাহফিলের আয়োজন করে আসছেন।
দরবার সংশ্লিষ্ট ভক্তরা বলেন, মেলা না থাকলেও ওরশের মূল উদ্দেশ্য—আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা, আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর প্রতি প্রেম এবং মানবকল্যাণ—অক্ষুণ্ন রয়েছে। তারা শান্তিপূর্ণভাবে ওরশ সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।