নিজস্ব প্রতিবেদক :
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরে নতুন করে আলোচনা ও মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত দলটির নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ইশরাকের পদত্যাগের মাত্র ১৮ দিন আগে মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও দখলচেষ্টার ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিও পদত্যাগ করেন। দুই ঘটনায় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর অবস্থানকে কেউ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন, শাস্তির ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
গত শনিবার রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে ইশরাকের অংশ নেওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর বিতর্ক তৈরি হয়। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন। তাঁর বক্তব্য, বিএনপি ও সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজের গুরুত্ব আড়ালে চলে যাওয়া ঠেকাতেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান মনে করেন, দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধরে রাখতে বিএনপিকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাঁর মতে, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার প্রচেষ্টার অংশ।
তবে বিএনপির নেতাদের একাংশ ইশরাকের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তকে অতিরিক্ত কঠোর বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য সতর্ক করা বা অন্য কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। একই সঙ্গে দলের অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, ইশরাকের পদত্যাগে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন। অন্যদিকে দলের কয়েকজন নেতা মনে করেন, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পেছনে কী ধরনের তথ্য ও পরিস্থিতি কাজ করেছে, তা সবার জানা নেই।
ইশরাকের অভিযানে অংশ নেওয়ার পেছনে কারা পরামর্শ দিয়েছেন, তা নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। কয়েকজন মন্ত্রী ও তরুণ নেতা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়াও বিতর্ক বাড়িয়েছে।
এদিকে, বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজি, দখল ও অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ উঠলেও এসব ঘটনায় কতজনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত এবং কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, ইশরাকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অর্থ এই নয় যে দল সব ক্ষেত্রে একইভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাঁর মতে, জনমত সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে আসিফ শাহানের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা হচ্ছে—বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পরিণতি হতে পারে। বিশ্লেষক মুশতাক হোসেনও বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা সফল হলে রাজনৈতিকভাবে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, কঠোর সিদ্ধান্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে। আবার দলের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্য, আইন ও দলীয় সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে কেউ নন। ফলে ইশরাকের পদত্যাগকে ঘিরে বিতর্কের পাশাপাশি বিএনপির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক অবস্থান এবং অন্য অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।