নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ পর্যন্ত জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। তবে এখনো অপেক্ষমাণ রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ১০টি আবেদন। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে বাতিল হয়েছে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন।
ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে। আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি অযৌক্তিক আবেদন যাচাই, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সাল পর্যন্ত জমা পড়া এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আবেদনগুলোর নিষ্পত্তিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে প্রতি মাসে গড়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার নতুন আবেদন জমা পড়ায় কিছু আবেদন অপেক্ষমাণ থাকছে। একই বিষয়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুনরায় আবেদন করার প্রবণতাও এ চাপ বাড়াচ্ছে।
‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে অপেক্ষমাণ প্রায় ৬৯ হাজার আবেদন
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে ৬৮ হাজার ২৬৯টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৫ সালের একই ক্যাটাগরিতে অপেক্ষমাণ রয়েছে আরও ৯৮৩টি আবেদন। সব মিলিয়ে এ ক্যাটাগরিতে অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যা ৬৯ হাজার ২৫২টি।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ঢাকা অঞ্চলে ১০ হাজার ৬১৫টি, ফরিদপুরে ৫ হাজার ১৪০টি, খুলনায় ৫ হাজার ৮৭১টি, ময়মনসিংহে ৮ হাজার ৩৩২টি এবং রংপুরে ৪ হাজার ৪৭৭টি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে। এ ছাড়া সিলেটে ৬ হাজার ৪৬৯টি, রাজশাহীতে ৬ হাজার ৮৭৫টি, বরিশালে ৪ হাজার ২২৬টি, চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৬৮৮টি এবং কুমিল্লায় ১০ হাজার ৫৫৯টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
অঞ্চলভেদে আবেদনের চাপের পার্থক্য থাকায় দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোতে তদারকি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
নিষ্পত্তিতে সময়সীমা, কমেছে প্রশাসনিক ধাপ
আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়াতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আবেদন নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। সিনিয়র ব্যবস্থাপনা পর্যায় এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালকেরা নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বাসসকে বলেন, আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্ভুলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমনভাবে ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন কমে আসে।
তিনি জানান, আগে অযৌক্তিক আবেদন সব ক্ষেত্রে যথাযথভাবে যাচাই করা হতো না। বর্তমানে সংশোধনের যৌক্তিকতা নেই—এমন আবেদন বাতিল করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিটি আবেদন নিষ্পত্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু আবেদনে সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা আর নেই। আবার বিদেশে অবস্থানরত ভোটারদের কিছু আবেদনে স্থানীয় প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যেও অসংগতি পাওয়া গেছে। যাচাই-বাছাই শেষে এসব আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
জন্মতারিখ সংশোধনে বাড়তি নজরদারি
জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষাসনদকে গুরুত্ব দিয়ে তদারকি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন।
গত ১৩ আগস্ট জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, অনলাইনে যাচাই করা যায়—এমন জেএসসি, মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষাসনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন ‘ক’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা নিষ্পত্তি করতে পারবেন। তবে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
এ ছাড়া আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাজ পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে প্রতি মাসে প্রত্যেক নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার অন্তত তিনটি আবেদন যাচাই করে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। এর মাধ্যমে সিদ্ধান্তের যথার্থতা ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায় কমিশন।
অসংগতি থাকলে আবেদন বাতিল
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে বলেন, কিছু আবেদন রয়েছে, যেগুলো সংশোধনযোগ্য নয়। বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে কখনো বাবা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান মাত্র ১০ বছর দেখা যায়। আবার সংশোধনের পর কোনো ব্যক্তির ভোটার হওয়ার সময় বয়স ১৮ বছরের কম ছিল—এমন অসংগতিও ধরা পড়ে। এসব ক্ষেত্রে আবেদন বাতিল করা হয়।
তিনি আরও জানান, কোনো আবেদন এক ক্যাটাগরিতে বাতিল হওয়ার পর কেউ কেউ অন্য ক্যাটাগরিতে আবার আবেদন করেন। এতে একই ধরনের আবেদনের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা বেশি বলে মনে হতে পারে।
অপেক্ষমাণ আবেদন নিষ্পত্তিতে নিয়মিত বৈঠক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জালিয়াতি ঠেকাতে প্রযুক্তিগত উদ্যোগ
এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতি প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করা হচ্ছে। কমিশনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব