নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে আগামী কয়েক বছরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও এর পুরো দায় কারখানা মালিকদের ওপর চাপানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন ক্যাসকেইলের ডিকার্বনাইজেশন প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ পরিচালক জয়েস সোই।
তার মতে, পোশাকশিল্পের সবুজ রূপান্তরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, ব্যাংক, উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু তহবিল ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স’ বা বিভিন্ন উৎসের সমন্বিত অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের কার্বন নিঃসরণ কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা, সৌরবিদ্যুৎ ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন জয়েস সোই।
তিনি বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ডিকার্বনাইজেশনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে এ খাত।
জয়েস সোইর মতে, পোশাক কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমানোর বড় সুযোগ রয়েছে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়। জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, বর্জ্য তাপ পুনর্ব্যবহার, উন্নত বয়লার ব্যবহার, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সংগ্রহ এবং ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মতো উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
তিনি বলেন, ডিকার্বনাইজেশনকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে হবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করলে কারখানার জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে, দাম ওঠানামার ঝুঁকি কমবে এবং ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
ক্যাসকেইলের হিসাবে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো সম্মিলিতভাবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে নিজেদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে পারে। তবে কোনো কারখানা সৌরবিদ্যুতের জন্য উপযুক্ত কি না, তা নির্ধারণে ছাদের আয়তন, ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
জয়েস সোই জানান, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার ১২৯টি কারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কাজ করেছে ক্যাসকেইল ও জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড।
তার ভাষায়, ডিকার্বনাইজেশনের অন্যতম বড় বাধা হচ্ছে প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় করা। তাই কম সুদের ঋণ, গ্রিন ক্রেডিট এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির মতো অর্থায়ন ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত ক্যাসকেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক খাতে প্রায় ৬৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। অথচ অর্থায়নের ঘাটতি এখনও বড়। ফলে এ ব্যয়ের পুরোটা কারখানা মালিকদের একার পক্ষে বহন করা বাস্তবসম্মত নয়।
জয়েস সোইর মতে, পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও ডিকার্বনাইজেশনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কম কার্বন নিঃসরণকারী ও স্থিতিস্থাপক সরবরাহব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই উৎপাদনে এগিয়ে থাকা কারখানাগুলো ভবিষ্যতে বেশি ব্যবসার সুযোগ পেতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ যদি এই রূপান্তরে পিছিয়ে যায়, তাহলে কম কার্বন নিঃসরণে উৎপাদনে সক্ষম প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে জ্বালানি দক্ষতা, বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার, উন্নত বয়লার, বিদ্যুতায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি সংরক্ষণে সমন্বিতভাবে বিনিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
ডিকার্বনাইজেশন দ্রুত করতে সরকারের নীতিগত সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জয়েস সোই বলেন, বড় আকারে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য করপোরেট পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট বা সিপিপিএর কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন।
তার মতে, আগামী দুই থেকে তিন বছরে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি—বিদ্যুৎ গ্রিড ও সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন, ডিকার্বনাইজেশন প্রকল্পে অর্থায়নের ঘাটতি কমানো এবং সরকার, ব্র্যান্ড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো।
বাংলাদেশ এসব ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে এগোতে পারলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি পোশাক খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশের শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।