নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
কক্সবাজারের সৈকতে কৌতূহল থেকে শুরু, ঢেউ জয় করে এখন জাপানে দেশের পতাকা উড়ানোর স্বপ্ন
কক্সবাজার প্রতিনিধি
ছয় বছর আগেও সার্ফিং কী, সার্ফ বোর্ডই বা কী—সেসব সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না ফাতেমা আক্তারের। সৈকতে বেড়াতে গিয়ে অন্য মেয়েদের হাতে সার্ফ বোর্ড দেখে জন্মেছিল কৌতূহল। সেই কৌতূহল থেকেই প্রথমবার সমুদ্রের পানিতে নামা। শুরুতে ভয়, কান্না আর অনিশ্চয়তা থাকলেও একসময় ঢেউয়ের ওপর দাঁড়ানোর আনন্দ বদলে দেয় তার জীবন।
সেই কক্সবাজারের দশম শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমাই এবার বাংলাদেশের হয়ে এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ে অংশ নিতে যাচ্ছেন। জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ২০তম এশিয়ান গেমসে তিনি বাংলাদেশের একমাত্র নারী সার্ফার হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করবেন। দেশের কোনো নারী সার্ফারের জন্য এটিই প্রথম এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের সুযোগ।
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে এবারের এশিয়ান গেমস।
ফাতেমার সার্ফিংয়ের শুরু হয়েছিল একেবারেই হঠাৎ। বান্ধবীদের সঙ্গে কক্সবাজার সৈকতে ঘুরতে গিয়ে কয়েকজন মেয়েকে সার্ফিংয়ের জন্য যেতে দেখেন তিনি। তাদের সঙ্গে প্রথমবার পানিতে নেমে ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়ে ভয় পেয়েছিলেন। এমনকি কান্নাও করেছিলেন। তবে দ্বিতীয়বার বোর্ডে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সফল হওয়ার পর থেকেই সার্ফিংয়ের প্রতি তৈরি হয় গভীর ভালোবাসা।
এরপর নিয়মিত অনুশীলনই হয়ে ওঠে তার জীবনের অংশ। ধীরে ধীরে শখ পরিণত হয় নেশায়, আর সেই নেশাই তাকে নিয়ে যায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার স্বপ্নে।
তবে ফাতেমার পথ মোটেও সহজ ছিল না। তার বাবা নেই। তিন বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে মা-ই প্রধান অবলম্বন। অন্যের বাড়ি ও হোটেলে রান্নার কাজ করে সংসার চালান তিনি। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি সার্ফিংয়ের মতো ব্যয়বহুল খেলায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবও ছিল ফাতেমার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
শুধু আর্থিক প্রতিকূলতাই নয়, সমাজের নানা মন্তব্য ও সমালোচনার সঙ্গেও লড়তে হয়েছে তাকে। সার্ফ বোর্ড হাতে সৈকতে যাওয়া এবং সার্ফিংয়ের পোশাক নিয়ে নানা কটূক্তির মুখে পড়েছেন। অনেকেই তার মাকেও মেয়েকে এই খেলায় না পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
তবুও ফাতেমা থামেননি। বরং পরিবারের সমর্থন এবং নিজের আত্মবিশ্বাসকে শক্তি বানিয়ে এগিয়ে গেছেন সামনে।
২০২৬ সালের জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় নারী বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এশিয়ান গেমসের দলে নিজের জায়গা নিশ্চিত করেন তিনি। তার সঙ্গে পুরুষ বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন মোহাম্মদ মান্নান।
ফাতেমার সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ জাপানের বড় ঢেউ এবং বিশ্বের অভিজ্ঞ সার্ফারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। কক্সবাজারের তুলনায় জাপানের সমুদ্রের ঢেউ অনেক বেশি বড় ও ভিন্ন ধরনের হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
বাংলাদেশের সার্ফারদের বিদেশে উন্নত পরিবেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হলে দেশের খেলোয়াড়রা আরও ভালো ফল করতে পারবেন বলে মনে করেন ফাতেমা।
টেলিভিশনে নারী সার্ফার এরিন ব্রুকসের খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া ফাতেমার এখন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একদিন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য নিয়ে আসা।
জাপানের সমুদ্রে দাঁড়িয়ে দেশের লাল-সবুজ পতাকার সম্মান বাড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন কক্সবাজারের এই কিশোরী। আর তার চাওয়া, তাকে দেখে বাংলাদেশের আরও অনেক মেয়ে ভয়-সংকোচ পেছনে ফেলে নিজেদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে আসুক।