নিউজ প্রবাসী ডেক্স:

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও মুদ্রণকাজে দেখা দিয়েছে অসম অগ্রগতি। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ এগিয়ে থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ের বই মুদ্রণে পিছিয়ে রয়েছে একাধিক ছাপাখানা। এ পরিস্থিতিতে কাজের গতি বাড়াতে ৩২টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

এনসিটিবির ২৮ অক্টোবরের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার অগ্রগতি প্রায় ৯৩ শতাংশ। অন্যদিকে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বইয়ের। বিশেষ করে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার ধীরগতিতে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এবার ৬২৩টি লটে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে পাঠ্যবই ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তর মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বইও এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

মাধ্যমিকের বই ছাপায় পিছিয়ে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি ছাপা হয়েছে। এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ।

প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বই ছাপানোর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি। এ হিসাবে অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

ইবতেদায়ি স্তরে ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।

অন্যদিকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরে ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বই ছাপানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি বইয়ের। এ স্তরে অগ্রগতি ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ।

নিম্নমানের বই ও ফর্মা বাতিল

পাঠ্যবইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৫৩টি তদারকি দল কাজ করছে। পরিদর্শনে মানদণ্ড পূরণ না করায় ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের ৯ লাখ ফর্মা ও ১২ হাজার নিম্নমানের ছাপানো বই বাতিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানিয়েছেন, মুদ্রণকাজে ধীরগতির কারণে ইতোমধ্যে ৩২টি প্রেসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ বাতিল করে অন্য ছাপাখানার মাধ্যমে বাকি কাজ শেষ করা হবে।

তিনি বলেন, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ ৯০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। তবে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার গতি তুলনামূলক কম। কয়েকটি লটে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

নভেম্বরের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য

চুক্তি অনুযায়ী, ৩ নভেম্বরের মধ্যে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির ৫০ শতাংশ বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে থাকা কয়েকটি লটে এ লক্ষ্য অর্জনের মতো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানিয়েছেন, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই মুদ্রণ ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের ৯৫ শতাংশের বেশি বই সরবরাহের প্রত্যাশা রয়েছে।

এবার বই গ্রহণের সময় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সরাসরি বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বই গ্রহণের পর মানের বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, নিম্নমানের কাগজে ছাপানো বই সরবরাহ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারের লক্ষ্য, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণির মানসম্মত পাঠ্যবই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, যাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা নতুন বই হাতে পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts