নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি কাঁচাবাজার অন্যত্র সরানোর উদ্যোগ প্রায় দুই দশকের পুরোনো। গাবতলী, মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতে বিকল্প বাজার নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘ সময়েও সেখানে কারওয়ান বাজারের আড়তদারদের বড় পরিসরে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। নতুন করে বাজার সরানোর নির্দেশনার পর পুরোনো সেই প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে—ব্যবসায়ীদের জন্য প্রস্তুত বিকল্প কোথায়?
কারওয়ান বাজারের পাইকারি কাঁচাবাজার ঘিরে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ আড়তদার রয়েছেন বলে ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর তথ্য। বাজারটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ১৪টি ব্যবসায়ী গ্রুপ। এত বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ীকে একসঙ্গে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অবকাঠামো, বরাদ্দ, পণ্য ওঠানামা ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের যাতায়াত—সবকিছু নিয়েই রয়েছে প্রশ্ন।
২০০৬ সালে কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসা গাবতলী, মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতে স্থানান্তরের জন্য ‘ঢাকা শহরের তিনটি পাইকারি কাঁচাবাজার নির্মাণ’ প্রকল্প নেওয়া হয়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্প শেষ করতে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয় বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় তিন বাজারে ২ হাজার ৯৩৯টি দোকান নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে ৮৯৫, গাবতলীতে ৫৪৯ এবং মহাখালীতে ৩৬০ জন ব্যবসায়ীকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
বর্তমানে গাবতলীর বাজারের অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে সেখানে ডিএনসিসির বিভিন্ন যানবাহন, এক্সেভেটর ও ডাম্প ট্রাক রাখার পাশাপাশি বাজারের ভবনের বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখা গেছে। কোনো আড়ত সেখানে স্থানান্তরিত হয়নি।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বর্তমান অবকাঠামোতে সেখানে বড় পাইকারি ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হবে। তাদের মতে, শুধু বাজারের জায়গা নির্ধারণ করলেই হবে না; পণ্য ওঠানো-নামানো, ট্রাক চলাচল, ক্রেতাদের যাতায়াত এবং ব্যবসার উপযোগী পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
কারওয়ান বাজার পাইকারি কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফিরোজ আলমের ভাষ্য, গাবতলীতে যেসব জায়গায় তাদের নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে ট্রাক, রড ও সিমেন্ট রাখা রয়েছে। ফলে ওই স্থানকে তাৎক্ষণিকভাবে পাইকারি বাজার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর কারওয়ান বাজার আদর্শ ফল ব্যবসায়ী আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি আবু সালেক বলেন, হাজার হাজার ব্যবসায়ীর জন্য বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রয়োজন। ঢাকার বাইরে বা আশপাশে বড় পরিসরে একটি আধুনিক পাইকারি বাজার তৈরি করা হলে ব্যবসায়ীরা সেখানে যেতে আগ্রহী হতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন।
কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য কার্যক্রম চালানোর কথা জানানো হয়েছে। ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিবুল আলম জানান, বাজার ছাড়ার বিষয়ে মাইকিং করে ব্যবসায়ীদের সচেতন করা হচ্ছে। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন এ প্রচার চালানো হচ্ছে।
তবে বিকল্প তিন বাজারের বরাদ্দ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ডিএনসিসির ওই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে শুধু যাত্রাবাড়ীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গাবতলী ও মহাখালীর বিষয়ে এখনো নীতিগত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের জন্য কী ব্যবস্থা করা হবে, সে বিষয়েও নীতি পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে সংস্থাটি।
মহাখালীর বাজার ভবনটি বর্তমানে ডিএনসিসি হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যাত্রাবাড়ীতে কিছু দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলেও কারওয়ান বাজারের কোনো আড়ত সেখানে গিয়ে ব্যবসা শুরু করেনি। ফলে তিনটি বিকল্প বাজারের মধ্যে কার্যত কোনোটি এখনো কারওয়ান বাজারের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
এদিকে কারওয়ান বাজারের বর্তমান ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৩ সালের বুয়েটের এক প্রতিবেদনে ডিএনসিসির আওতাধীন কয়েকটি মার্কেটকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কারওয়ান বাজারের একাধিক মার্কেট ও কাঁচামালের আড়ত ভবনকে ‘অতি নাজুক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল এসব মার্কেট পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ডিএনসিসি। এরপরও সেখানে ব্যবসা চলছে।
কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের পক্ষে ডিএনসিসির যুক্তি হলো—পরিকল্পিত বাজারে পাইকারি ব্যবসা সরানো গেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকার যানজট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বাজারটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ব্যবসায়ী, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
ফলে দুই দশক ধরে চলা স্থানান্তর উদ্যোগের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু কারওয়ান বাজার খালি করা নয়; বরং ব্যবসায়ীদের জন্য কার্যকর বিকল্প তৈরি করে তাদের সেখানে নেওয়া। পুরোনো বাজার থেকে আড়ত সরানোর নির্দেশনা এলেও সেই বাস্তবায়নের পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়।