নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, তাঁর ডানপন্থি জোটের ভবিষ্যৎ এবং দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ও বিরোধীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত মিলেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা, এরপর গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান চাপ—সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধও নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলছে।
বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় ১৯ বছর ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী। এবার তাঁর লিকুদ পার্টি ও ডানপন্থি মিত্রদের সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। বিরোধী শিবিরে ইয়ার লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের মতো নেতারাও রয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা জনমত জরিপ অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে নেতানিয়াহুর জোটের সামনে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে দেশটির বিভক্ত রাজনৈতিক কাঠামোয় নির্বাচনের পর জোট গঠনের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা রাত ১০টা পর্যন্ত চলার কথা। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ৭৩ লাখ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন।
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু তাঁর যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ইরানের হুমকি মোকাবিলায় ট্রাম্প আরও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, আইজেনকোট নেতানিয়াহুর প্রচারপদ্ধতির সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি ভয়ভীতি, মিথ্যাচার ও হুমকির ওপর নির্ভর করছেন। আইজেনকোটের বক্তব্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি সহযোগিতা করবেন।
সরকার গঠনে নেতানিয়াহুকে আবারও কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানির অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞা দিলেও বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টির সমর্থন বাড়ার কথা জরিপে উঠে এসেছে। মঙ্গলবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিরিয়াত আরবায় ভোট দেওয়ার পর বেন-গভির বলেন, নেতানিয়াহুই আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তাঁর দল সরকারে ডানপন্থি অবস্থান জোরদার করবে।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের কাছে এবারের নির্বাচন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় নির্ধারণেরও একটি উপলক্ষ। ক্ষমতায় গেলে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিরোধী জোটগুলো। হামলার সময় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হয়েছিলেন। এরপর গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
জিম্মিদের সবাইকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়েও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ রয়েছে। পাশাপাশি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির বিচার, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং তাঁর জোটের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। নেতানিয়াহু অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের ভিটারবি ফ্যামিলি সেন্টারের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ১৩ শতাংশ ভোটার তখনও সিদ্ধান্ত নেননি। ফলে অনিশ্চিত ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনী ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে। ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের ভোটের উপস্থিতিও সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোটে অনাগ্রহী হলেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে তারা আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
জেরুজালেমের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল বলেছেন, দুই পক্ষের ভোটের ব্যবধান খুব কম হতে পারে এবং কোনো পক্ষের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়।
২০২৩ সালের হামলার পর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন আইজেনকোট। তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করে আট মাস পর তিনি পদত্যাগ করেন। গাজা যুদ্ধ, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
১২০ আসনের পার্লামেন্টে কোনো পক্ষ প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারেন।