নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন খাতে নেওয়া উদ্যোগ ও অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর দেশে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে সরকার আশা করছে।
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাসের প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে বলে দাবি করেন তিনি। শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি ধরে রাখাকে এর অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, গত সাত মাসে প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতিমুক্ত সেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি, যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প ও জনস্বাস্থ্য খাতেও বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন তিনি।
জ্বালানি খাতে বড় পরিকল্পনা
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মধ্যমেয়াদে দেশে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের কর্মসূচি চলছে বলে জানান মাহদী আমিন। এ পর্যায়ের কাজ শেষ হলে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৮ সালের মধ্যে সম্ভব হলে তৃতীয় এফএসআরইউ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এ সংখ্যা পাঁচটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ১৮ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন এবং চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে ১ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক অর্থায়নের কথাও জানান তিনি।
বিদ্যুৎ খাতে কারিগরি ত্রুটি দূর করে জাতীয় গ্রিডে ১ হাজার ৪৬ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট সরবরাহ বাড়ানোর দাবি করেন মাহদী আমিন। ভোলায় ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একটি সার কারখানা স্থাপন এবং জাতীয় গ্রিডে নতুন ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নানা উদ্যোগ
ঢাকাসহ আট বিভাগীয় শহরে ১৫ তলা বিশেষায়িত জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান মাহদী আমিন। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাশ্রয়ী ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ এবং বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ৮০০-তে উন্নীত করার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
গত পাঁচ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়ার তথ্যও দেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী দেশে টিকা উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরুর কথাও জানান।
শিক্ষাক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপবৃত্তি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুষ্টিকর খাবারের স্থায়ী ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথাও ব্রিফিংয়ে উঠে আসে।
পে-স্কেল ও সামাজিক নিরাপত্তা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পর্যন্ত জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের কথা জানান মাহদী আমিন। সরকারি চাকরিজীবীদের মোবাইল ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের নিট পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান থাকা অবসরপ্রাপ্তদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান মুখপাত্র।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সরকারি ভাতা সম্প্রসারণ, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদান বৃদ্ধি, ঢাকার করাইল, ভাষানটেক ও তলা বস্তি পুনর্বাসনে চীনা অর্থায়নের প্রস্তাবসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
যোগাযোগ ও নগর ব্যবস্থাপনা
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিস্তারিত নকশা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন সম্প্রসারণ এবং মহাসড়কে ক্যাশলেস স্বয়ংক্রিয় টোল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।
ঢাকার যানজট কমাতে কারওয়ান বাজারের পাইকারি কাঁচাবাজার গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে স্থানান্তরের কার্যক্রম চলছে বলে জানান তিনি।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ডিজিটাল নিবন্ধন, বারকোড ও কিউআর কোডভিত্তিক নজরদারি, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মুখপাত্র।
অর্থনীতি, রেমিট্যান্স ও শ্রমবাজার
মাহদী আমিন জানান, গত পাঁচ মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে সরকার। একই সময়ে প্রবাসী আয় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ শেষে প্রতিবছর ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর ইতালি যাওয়ার সুযোগ এবং ওমানের কৃষি ও আধুনিক মৎস্য খাতে আরও ১০ হাজার কর্মী পাঠাতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অগ্রগতির কথাও জানান তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি এবং চিহ্নিত ৬১টি বাণিজ্য বাধার মধ্যে ৪৮টির সমাধান হয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন।
প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চীন থেকে ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
সীমান্ত নজরদারিতে বিজিবিকে ড্রোনে সজ্জিত করা, সিলেটে বিশেষায়িত ড্রোন ওয়ারফেয়ার প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন, ঢাকা-সিউল সরাসরি নিয়মিত ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে বিশেষ ঋণ তহবিল গঠনের কথাও ব্রিফিংয়ে তুলে ধরা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, সরকারের সামনে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে সাত মাসের মধ্যে সব সমস্যার পূর্ণ সমাধান সম্ভব না হলেও সরকার বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts