আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
চীনসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে নতুন ধরনের গোপন গোয়েন্দা কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন—এমন খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে মার্কিন গোয়েন্দারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী কিংবা কর্মকর্তার পরিচয়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা গোপন রাখা হবে বলে পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘নন-অফিশিয়াল কভার অফিসার্স’ বা এনওসি নামে পরিচিত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো। বিশেষ করে চীনের প্রযুক্তি, শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে এ ধরনের গোয়েন্দা তৎপরতা ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে কর্মসূচিটি এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এর কার্যক্রম কবে শুরু হবে কিংবা পেন্টাগনের কোন বিভাগের অধীনে এটি পরিচালিত হবে, তা স্পষ্ট নয়।
সাবেক সিআইএ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিকল্পনা
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএতে কাজ করা টম রাকুসান নতুন কর্মসূচিটির তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে মার্কিন উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।
রাকুসান ২০২১ সালে সিআইএ থেকে অবসর নেন। পরে ফেইনবার্গের প্রতিষ্ঠিত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সারবেরাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টে যোগ দেন। ২০২৫ সালে তিনি পেন্টাগনেও দায়িত্ব নেন।
পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখা, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগ এবং নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সিআইএর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদেরও এ উদ্যোগে যুক্ত করার বিষয়ে কাজ চলছে।
তবে নতুন কোনো স্বতন্ত্র গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করা হবে, নাকি বিদ্যমান গোপন মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
উদ্যোগের খবর অস্বীকার পেন্টাগনের
নতুন গোয়েন্দা কর্মসূচি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও পেন্টাগন এ ধরনের উদ্যোগ চলমান থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেকব ব্লিস এক বিবৃতিতে প্রতিবেদনটিকে মিথ্যা বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের কোনো কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে না। যারা খবরটি প্রকাশ করেছে, তাদের তথ্যের সত্যতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
এ বিষয়ে সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। টম রাকুসানের কাছেও বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কর্মসূচি সম্পর্কে কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে অবহিত করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব বাড়ছে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় শুল্ক, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ নীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত সম্পদ রক্ষায় বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বরে সিআইএর উপপরিচালক মাইকেল এলিস এক বক্তব্যে জানান, চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সক্রিয় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারির আওতায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চীনের বড় বড় কোম্পানির কার্যক্রম সম্পর্কে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই তথ্য সংগ্রহ করে আসছে। তবে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পরিকল্পনার খবর এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের বাড়তি আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন কোম্পানিকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার বিতর্ক
সিআইএর সাবেক উপপরিচালক ডেভিড এস কোহেন সম্প্রতি ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের পরিধি বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
তাঁর যুক্তি, গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পাওয়া অর্থনৈতিক গোপন তথ্য দেশের উন্নত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলো বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। এ ধরনের তথ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনারও পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে কোহেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব তথ্য দেশের কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক সুবিধায় ব্যবহার করা উচিত কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান এমন সুবিধা পাবে, সে ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব ও দুর্নীতি ঠেকাতে যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
তবে পেন্টাগনের প্রস্তাবিত এনওসি কর্মসূচি সম্পর্কে তাঁর কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন কোহেন।
এদিকে, পেন্টাগন চলতি বছর ‘ইকোনমিক ডিফেন্স ইউনিট’ নামে একটি অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা ইউনিট গঠনের ঘোষণাও দিয়েছে। ফলে সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বার্থ সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে চীনকে মোকাবিলায় প্রস্তাবিত গোপন গোয়েন্দা কর্মসূচির খবর পেন্টাগন অস্বীকার করায়, এর বাস্তব অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।