নিউজ প্রবাসী ডেক্স:

দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমার পাশাপাশি বাড়ছে ডলারের দাম। আমদানি ব্যয় পরিশোধের চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ডলার বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগেও বাজারে ডলারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকানো যাচ্ছে না।

এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের আমদানি বিল বাবদ ১৬৪ কোটি ডলার পরিশোধের পর গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দিন শেষে দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ নেমেছে ২৯ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে।

এর আগের দিন বুধবার (৪ নভেম্বর) গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। এক দিনের ব্যবধানে আকুর বিল পরিশোধের কারণে রিজার্ভ থেকে বড় অঙ্কের ডলার কমেছে।

রিজার্ভের পাশাপাশি ডলারের দামও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সায়। আমদানি দায় পরিশোধে ডলারের দাম ছিল ১২৪ টাকা ৮০ পয়সা। অন্যদিকে বুধবার খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১২৯ টাকায়। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় খোলাবাজারে প্রতি ডলারে প্রায় ৪ টাকা ২০ পয়সা বেশি দিতে হচ্ছে।

ব্যাংকারদের মতে, জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমদানি বিল পরিশোধ এবং রপ্তানি ও প্রবাসী আয় থেকে ডলার আসার তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।

রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রিতেও কমছে না চাপ

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে সম্প্রতি আবারও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বুধবার নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে গত সপ্তাহে বিক্রি করা হয়েছিল ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার।

তবে বাজারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এসব উদ্যোগে ডলারের দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ছে না। ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রায় ৮০ কোটি ডলারের চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করেছে মাত্র ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার।

গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়। ব্যাংকারদের ধারণা, ব্যাংকগুলোর প্রস্তাবিত দর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি থাকায় ওই নিলামে ডলার বিক্রি করা হয়নি।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময়ে ডলার বিক্রি বন্ধ রাখা এবং বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়ায় রিজার্ভে উন্নতি দেখা যায়। চলতি বছরের ২৯ জুন প্রথমবারের মতো গ্রস রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। গত ১ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এরপর থেকেই রিজার্ভ কমতে শুরু করে।

আমদানি ব্যয় বাড়ায় ডলারের চাহিদা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার।

এ সময়ে ইপিজেডসহ এফওবি মূল্যে আমদানি ব্যয় ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭ শতাংশ। এ সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম জানান, জুলাই-আগস্টে আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক মাসেই আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।

তিনি বলেন, আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রপ্তানি আয় বাড়েনি। ফলে আমদানি ও রপ্তানির মধ্যকার ব্যবধান বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্য ও কাঁচামালের দাম বেশি থাকায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।

বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় ডলারের বাজারে চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৫০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ১২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার বৈদেশিক বিল পরিশোধের চাপও ডলারের চাহিদা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে ৮০০ কোটি ডলারের বেশি আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। একই মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি এলসি।

রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে প্রত্যাশিত গতি নেই

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি উৎস রেমিট্যান্স ও রপ্তানি। এই দুই খাত থেকে আয় এলেও আমদানি ব্যয়ের তুলনায় সরবরাহ যথেষ্ট না হওয়ায় বাজারে ডলারের সংকট তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে ২৭৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। অক্টোবরে তা বেড়ে ২৮৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে গত কয়েক মাসের তুলনায় প্রবাসী আয়ের প্রবাহে কিছুটা মন্থরতা রয়েছে। এর আগে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, রেমিট্যান্সের প্রবাহ আগের তুলনায় কমেছে। রপ্তানি আয়ও আশানুরূপ নয়। এর সঙ্গে সরকারি এলসির বিল পরিশোধের বাড়তি চাপ রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ কম এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধের চাপ বেশি থাকায় ডলারের দাম বাড়ছে।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল ৮২১ মিলিয়ন ডলার।

খোলাবাজারে ডলার ১২৯ টাকা

ব্যাংকিং চ্যানেলের পাশাপাশি খোলাবাজারেও ডলারের দাম বেড়েছে। বুধবার সেখানে প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১২৯ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় দর ছিল ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা।

ব্যাংকারদের মতে, বিদেশে চিকিৎসা, শিক্ষা ও ভ্রমণের জন্য নগদ ডলারের চাহিদাও খোলাবাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে খোলাবাজারে দামের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ প্রতি ডলার ১২৮ টাকা ১০ পয়সার বেশি দামে বিক্রি না করার নির্দেশনা দিয়েছে। এর বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। তবে এরপরও খোলাবাজারে ১২৯ টাকা দরে ডলার বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

সামনে আরও চাপের আশঙ্কা

অর্থনীতিসংশ্লিষ্টদের মতে, ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য না ফিরলে রিজার্ভ এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেশি থাকলে এবং রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে ডলারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডলারের দাম বাড়লে আমদানি করা জ্বালানি, ভোজ্যতেল, গম, চিনি, ডাল ও শিল্পের কাঁচামাল কেনার খরচ বেড়ে যায়। আমদানিকারকেরা বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে সমন্বয় করলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও চাপ পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্পকারখানার কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়ানো, রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনা নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বাড়ানোও জরুরি।

কারণ, ডলারের চাহিদা মেটাতে একদিকে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানি দায় পরিশোধে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts