নিউজ প্রবাসী ডেস্ক

ডাইনোসরদের আধিপত্যের যুগে নদী ও হ্রদে সাঁতার কেটে শিকার করত ভোঁদড়সদৃশ এক স্তন্যপায়ী প্রাণী। চীনে প্রায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের এই প্রাণীর জীবাশ্ম আবিষ্কারের পর স্তন্যপায়ীদের বিবর্তন নিয়ে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, আধা-জলচর স্তন্যপায়ীর প্রাচীনতম পরিচিত উদাহরণগুলোর মধ্যে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাণীটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মেগাকাউডা সানগি’। জুরাসিক যুগে বসবাসকারী এই প্রাণীর জীবাশ্ম চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। আধুনিক প্লাটিপাসের মতো পানিতে চলাফেরা করলেও এর দাঁত ও চোয়াল ছিল ভোঁদড়ের মতো শিকার ধরার উপযোগী।

গবেষকদের হিসাবে, মেগাকাউডার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২০ ইঞ্চি এবং ওজন এক থেকে দুই কেজি। সে সময়ের অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল ছোট আকারের, অনেকটা ছুঁচোর মতো। তাদের তুলনায় মেগাকাউডা ছিল প্রায় দ্বিগুণ বড়।

জীবাশ্মটি বেশ ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল। এতে চামড়া ও পশমের ছাপ স্পষ্টভাবে পাওয়া গেছে। এর কঙ্কাল ও মাথার খুলির গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা স্তন্যপায়ীদের খাবার গ্রহণের বিবর্তন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন।

খাবার চিবানো ও গেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর জীবাশ্মবিদ ঝে-সি লুও বলেন, আধুনিক স্তন্যপায়ীদের খাবার গ্রহণের পদ্ধতি অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর তুলনায় আলাদা। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী দাঁত দিয়ে খাবার চিবিয়ে ছোট ছোট টুকরায় পরিণত করে, এরপর তা ধীরে ধীরে গিলে ফেলে।

মেগাকাউডার মাথার খুলির নিচে সূক্ষ্ম হাড়ের গঠন এবং গলার সঙ্গে যুক্ত হাড় পাওয়া গেছে, যা আধুনিক স্তন্যপায়ীদের মধ্যেও দেখা যায়। এসব হাড় গলা ও জিহ্বার পেশির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করত। এর ফলে প্রাণীটি শ্বাস নেওয়া ও খাবার গ্রহণের কাজ একই সঙ্গে করতে পারত বলে গবেষকদের ধারণা।

এই শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য স্তন্যপায়ীদের বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণাটি চলতি সপ্তাহে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

সাঁতারের জন্য উপযোগী ছিল দেহের গঠন

গবেষণার সহলেখক ও জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বনের জীবাশ্মবিদ থমাস মার্টিনের মতে, মেগাকাউডা পানিতে চলার সময় সামনের ও পেছনের পা বৈঠার মতো ব্যবহার করত। লেজ নাড়িয়ে দেহ বাঁকিয়ে এটি সামনে এগিয়ে যেত। প্রাণীটি নদী বা হ্রদের তীরে গর্ত খুঁড়ে বসবাস করত বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

এর ধড় ও পেছনের পায়ের গঠনের সঙ্গে আধুনিক প্লাটিপাসের মিল রয়েছে। তবে প্লাটিপাসের মতো চ্যাপ্টা ঠোঁট ছিল না। বরং এর লেজ ছিল চওড়া ও চ্যাপ্টা, যা বিভার ও প্লাটিপাসের লেজের কথা মনে করিয়ে দেয়। লেজটি ছোট ছোট আঁশে ঢাকা ছিল।

মেগাকাউডার দাঁত ও চোয়ালও ছিল শিকার ধরার উপযোগী। এর পেছনের দিকে বাঁকানো দাঁত পিচ্ছিল শিকার বা মাছ আটকে রাখতে সাহায্য করত। পাকস্থলীর অবশিষ্টাংশে ছোট ছোট হাড়ের টুকরা পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায়, এটি ছোট আকারের মেরুদণ্ডী প্রাণী খেত। জীবাশ্ম পাওয়া একই অঞ্চলে স্যালামান্ডারের জীবাশ্মও মিলেছে।

দীর্ঘদিন টিকে ছিল বিলুপ্ত এই গোষ্ঠী

মেগাকাউডা ছিল ‘ডোকোডন্ট’ নামের এক বিলুপ্ত স্তন্যপায়ী গোষ্ঠীর সদস্য। গবেষকদের তথ্যমতে, প্রায় ২০ কোটি বছর আগে এই গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল এবং প্রায় ৯ কোটি বছর ধরে তারা পৃথিবীতে টিকে ছিল। বর্তমানে এদের কোনো প্রত্যক্ষ বংশধর জীবিত নেই।

ডোকোডন্ট গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রজাতির জীবনযাপনে বৈচিত্র্য ছিল। কোনোটি মাটির নিচে গর্ত করে বাস করত, কোনোটি গাছে উঠত, আবার মেগাকাউডার মতো কোনো কোনো প্রজাতি জল ও স্থল—দুই পরিবেশেই চলাফেরা করত।

গবেষক ঝে-সি লুও বলেন, ডাইনোসরদের আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও সে সময়ের স্তন্যপায়ী প্রাণীরা নানা পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিল। মেগাকাউডার জীবাশ্ম আবিষ্কার সেই বৈচিত্র্যের আরও প্রমাণ তুলে ধরেছে।

তবে প্রাণীটিকে শিকারি ডাইনোসরের আক্রমণ থেকে সতর্ক থাকতে হতো। গবেষকদের ধারণা, পালকযুক্ত মাংসাশী থেরোপড ডাইনোসর ছিল এর অন্যতম প্রধান শত্রু। এ কারণে মেগাকাউডা হয়তো রাতে কিংবা ভোর ও গোধূলির কম আলোয় খাবারের সন্ধানে বের হতো।

বিজ্ঞানীদের মতে, নতুন এই জীবাশ্ম শুধু প্রাচীন স্তন্যপায়ীদের জলজ জীবনযাপন সম্পর্কেই নয়, বরং তাদের খাদ্য গ্রহণ, শারীরিক গঠন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিবর্তন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts