বিশ্বাস ওয়াহিদুজ্জামান
মানুষকে সজাগ ও সচেতন করে তুলতে সারা বছর নানা দিবস পালন করা হয়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস। প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য—‘Literacy for people, the planet and prosperity’ বা মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জউপসম্পাদকীয় ন্য সাক্ষরতা।
বাংলাদেশেও দিবসটি বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতীতে দেশে সাক্ষরতার হার বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম, মসজিদ ও মন্দিরভিত্তিক সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন এনজিওর কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষর করে তোলার চেষ্টা হয়েছে।
এসব উদ্যোগ যে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে, তা বলা যাবে না। অনেক মানুষ সাক্ষরতার সুযোগ পেয়েছেন। তবে সমস্যা হচ্ছে, অর্জিত সাক্ষরতা ধরে রাখা এবং নতুন করে নিরক্ষরতার সৃষ্টি ঠেকানো। কেবল নাম লিখতে পারা বা অক্ষর চিনতে পারাই যথেষ্ট নয়; দৈনন্দিন জীবনে পড়া, লেখা, যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ, হিসাব রাখা, সাইনবোর্ড পড়া, ভাউচার লেখা ও বোঝার মতো ব্যবহারিক দক্ষতাও সাক্ষরতার অংশ।
ভোটের ব্যালটে প্রার্থীর নাম পড়ার সুযোগ
বাংলাদেশে নির্বাচন একটি নিয়মিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক, পেশাজীবী ও সাংগঠনিক নির্বাচনেও মানুষ ভোট দেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ভোটাররা প্রার্থীর নাম পড়ার চেয়ে প্রতীক দেখেই ভোট দেওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
এখানে একটি ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
ভোটের ব্যালট পেপারে প্রতীকের পাশাপাশি প্রার্থীর নাম ও প্রয়োজনীয় পরিচয় স্পষ্ট ও বড় অক্ষরে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে কোনো কোনো নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে শুধু প্রার্থীর নামকেন্দ্রিক ব্যালট ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এর ফলে ভোটারকে নিজের পছন্দের প্রার্থীর নাম পড়তে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর একটি সামাজিক প্রণোদনা হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের কর্মী, তরুণ ও শিক্ষার্থীরা যদি নিজেদের এলাকার নিরক্ষর মানুষকে প্রার্থীর নাম পড়তে শেখানোর উদ্যোগ নেন, তাহলে এর সঙ্গে সাক্ষরতা আন্দোলনও যুক্ত হতে পারে।
তবে এমন ব্যবস্থা চালুর আগে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আইনগত, কারিগরি ও বাস্তব দিক পরীক্ষা করে সীমিত পরিসরে পাইলট প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
শিক্ষার্থীদের দিয়ে সাক্ষরতা কার্যক্রম
সাক্ষরতা বিস্তারে দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এসএসসি/দাখিল থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সাক্ষরতা দান’ নামে একটি ধারাবাহিক মূল্যায়ন চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থীকে দুই বছরের মধ্যে তার আশপাশের ১০ থেকে ২০ জন নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষকে মৌলিক সাক্ষরতা শেখানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো। শিক্ষার্থী তার কাজের বিবরণ একটি ব্যবহারিক খাতায় তারিখসহ লিখবে। শিক্ষক বা স্থানীয় দুজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি তা প্রত্যয়ন করতে পারেন। কার্যক্রম শেষে যিনি সাক্ষরতা অর্জন করেছেন, তাঁর নিজের হাতে লেখা একটি নমুনা ও সংক্ষিপ্ত অভিব্যক্তিও সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ শুধু পরীক্ষার নম্বরের জন্য নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরির মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যদি একজন মানুষকেও পড়তে ও লিখতে শেখান, তাহলে সেটিই হতে পারে তার শিক্ষাজীবনের অন্যতম বড় অর্জন।
তৈরি হতে পারে নতুন সামাজিক সংস্কৃতি
দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী, তরুণ ও রাজনৈতিক কর্মী যদি নিজ নিজ এলাকায় সাক্ষরতা কার্যক্রমে যুক্ত হন, তাহলে গ্রাম-মহল্লায় ছোট ছোট রাতের পাঠশালা গড়ে উঠতে পারে। স্থানীয়ভাবে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
যারা সবচেয়ে বেশি মানুষকে সাক্ষর করে তুলবেন, তাদের ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস বা বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পুরস্কার ও সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সামাজিকভাবে সাক্ষরতা দান একটি মর্যাদাপূর্ণ কাজে পরিণত হবে।
বর্তমান বিশ্বে সাক্ষরতার ধারণাও বদলাচ্ছে। UNESCO বলছে, আজকের দিনে শুধু পড়া-লেখার সক্ষমতাই যথেষ্ট নয়; ডিজিটাল যুগে তথ্য বুঝতে, যাচাই করতে এবং প্রযুক্তি নিরাপদভাবে ব্যবহার করতেও সক্ষম হতে হবে।
উপসংহার
দেশে সাক্ষরতা বিস্তারে অতীতে নেওয়া সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগগুলো অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে নতুন ও সৃজনশীল পদ্ধতিও খুঁজে বের করা জরুরি।
ভোটের প্রক্রিয়াকে সাক্ষরতার প্রণোদনা হিসেবে ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের ‘সাক্ষরতা দান’ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী পাঠশালা গড়ে তোলা—এসব উদ্যোগ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবা যেতে পারে।
সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, এনজিও এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সাক্ষরতা শুধু একটি সরকারি কর্মসূচি থাকবে না; এটি পরিণত হতে পারে একটি সামাজিক আন্দোলনে।
সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সাক্ষর, দক্ষ, সচেতন ও জ্ঞাননির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।
লেখক: বিশ্বাস ওয়াহিদুজ্জামান
প্রাবন্ধিক, শিক্ষাকর্মী ও সমাজ উন্নয়ন গবেষণারত ব্যক্তি
যশোর