নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
গত দুই মাসে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৩০ কেজি কুশ জব্দের ঘটনায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে দেশে কুশের একটি সম্ভাব্য বাজার তৈরির বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না মাদক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে বিমানবন্দরে পাঁচটি পৃথক অভিযানে মোট ২৯ কেজি ৩৪০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জনই ভারতের নাগরিক এবং তারা থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসেই কুশের চারটি চালান আটক করা হয়। সর্বশেষ ২৭ আগস্ট ব্যাংকক থেকে ঢাকায় আসা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আবদুল রহমান ও মোহাম্মদ ইকবাল আনসারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের ট্রলি ব্যাগ থেকে ৫ কেজি ১২০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ২৪ আগস্ট উত্তর চব্বিশ পরগণার সানাওয়ার আলী ও ইমতিয়াজ আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ভারতীয় শাড়ির আড়ালে লুকানো ৫ কেজি ৪০ গ্রাম কুশের পাশাপাশি তিন লিটার বিদেশি মদ ও ২৪টি শাড়ি উদ্ধার করা হয়।
২২ আগস্ট থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে আসা ভারতের কর্ণাটকের হুসাইন আবদুল কাদের শেখের কাছ থেকেও তিন কেজি কুশ পাওয়া যায়। তার ট্রলি ব্যাগে কাপড়ের নিচে এসব মাদক লুকানো ছিল।
১৮ আগস্ট একই এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ঢাকায় এসে দুটি ট্রলি ফেলে পালিয়ে যান কলকাতার আকাশ দুবে ও আকাশ পান্ডে। পরে ওই ট্রলি থেকে ৪ কেজি ১৮০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও দুজনকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
এ ছাড়া জুলাইয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রায় ১১ কেজি কুশসহ জুলফিকার নামে এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
দেশে কুশের উপস্থিতি নতুন নয়
বাংলাদেশে কুশের প্রথম বড় ধরনের সন্ধান মেলে ২০২২ সালের আগস্টে। সে সময় ঢাকার গুলশান থেকে এক ব্যক্তিকে আটক করে কুশ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল র‍্যাব। ওই ব্যক্তি নিজে মাদক সেবন না করলেও বিদেশ থেকে এনে এবং নিজস্ব ব্যবস্থায় উৎপাদন করে অভিজাত এলাকার পার্টিতে তা সরবরাহ করতেন বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।
পরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ভাড়া নেওয়া একটি ফ্ল্যাটে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বিশেষ তাঁবুতে কুশ চাষের ব্যবস্থার সন্ধানও পাওয়া যায়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার ওয়ারীতে বাসায় ল্যাব স্থাপন করে কুশ উৎপাদনের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এছাড়া গত ৬ আগস্ট সাতক্ষীরা সীমান্তে ভারতে পাচারের সময় ১২ কেজি কুশের একটি চালান জব্দ করে বিজিবির ৩৩ ব্যাটালিয়ন। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়।
গাঁজার চেয়ে শক্তিশালী
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক জানান, কুশ মূলত গাঁজা গাছের একটি জাত বা উপজাত। রাসায়নিক উপাদানের কারণে এটি সাধারণ গাঁজার তুলনায় বেশি শক্তিশালী। বিশেষ পরিবেশে কৃত্রিম আলো ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় এ ধরনের গাছ চাষ করা সম্ভব।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কুশ ও সাধারণ গাঁজার প্রধান মাদকীয় উপাদান টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল বা THC। তবে কুশে এর মাত্রা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এর নেশার প্রভাবও বেশি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরীর মতে, দীর্ঘদিন ক্যানাবিসজাত মাদক গ্রহণ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ক্ষুধামন্দা, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া, আচরণগত পরিবর্তন এবং শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ট্রানজিট রুটের আশঙ্কা
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, বাংলাদেশে কুশ এখনো প্রচলিত মাদক নয়। আগে বিদেশফেরত শিক্ষার্থী বা চাকরিজীবীরা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অল্প পরিমাণে এটি আনতেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বড় বড় চালান আটকের ঘটনায় বাংলাদেশকে অন্য দেশে মাদক পাঠানোর একটি মধ্যবর্তী রুট হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
শাহজালাল বিমানবন্দরে আটক চালানগুলোর তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ মিয়া বলেন, ঘটনাগুলো অনেকটা একই ধরনের। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সবাই ভারতীয় নাগরিক। বাংলাদেশে তাদের কোনো স্থানীয় সহযোগী আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার জানান, এসব ঘটনায় মামলা হলেও মূল তদন্ত করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তদন্তে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে এবং কুশের চালান কোথায় নেওয়া হচ্ছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, থাইল্যান্ড হয়ে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে কুশ পরিবহনের একটি আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। এমনকি এর সঙ্গে বাংলাদেশের একটি স্থানীয় চক্রের যোগাযোগ থাকার তথ্যও তারা পেয়েছে বলে দাবি করেছেন ওই কর্মকর্তা।
তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts