নিউজ প্রবাসী ডেক্স:

যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘ ৪৯১ দিন চরম দুর্ভোগের মধ্যে কাটিয়েছেন ইউক্রেনের সেনা কনস্ট্যান্টিন ভ্লাসেনকো। একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে নিজের পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ নিজেই কেটে ফেলতে বাধ্য হন তিনি। অবশেষে গত ৪ অক্টোবর বিশেষায়িত একটি ভারী ড্রোনের সাহায্যে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। প্রায় ১৫ কিলোমিটার আকাশপথ পাড়ি দিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয় ৪৯ বছর বয়সী এই সেনাকে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর খারকিভ অঞ্চলের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভ্লাসেনকো। ভবনের বয়লার কক্ষের নিচে মাত্র ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আয়তনের একটি সংকীর্ণ গর্তে তাঁকে আত্মগোপন করে থাকতে হয়। চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা না থাকায় তাঁর অবস্থা ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় তাঁর বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই ঘটনায় ডান পা-ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ও পচন দেখা দিলে বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের ডান পায়ের নিচের অংশ ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেন তিনি। এরপর রক্তপাত বন্ধ করতে ক্ষতস্থান শক্ত করে বেঁধে রাখেন।

সহযোদ্ধার মৃত্যু, বাড়ে বিপদের আশঙ্কা

ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য। খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখযুদ্ধের বিপজ্জনক এলাকায় ‘বাস্কি’ ছদ্মনামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে তাঁদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানো হতো।

একপর্যায়ে তাঁদের সরিয়ে নিতে আসা চার সেনা রুশ হামলায় নিহত হন। এতে উদ্ধার পাওয়ার আশা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়ে। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁদের আশ্রয়স্থল পানিতে ডুবে গেলে দুজন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন। সেখানে রসদ সংগ্রহের সময় রুশ ড্রোনের হামলায় বাস্কি নিহত হন। ওই হামলাতেই গুরুতর আহত হন ভ্লাসেনকো।

সাঁজোয়া যান নয়, উদ্ধার অভিযানে ড্রোন

যুদ্ধক্ষেত্রের বিপজ্জনক এলাকায় সাঁজোয়া যান পাঠিয়ে আহত সেনাদের উদ্ধার করার একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বিকল্প পদ্ধতি খুঁজতে থাকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। কারণ, রুশ ড্রোনের হামলায় উদ্ধারকাজে পাঠানো যানগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল।

এ অবস্থায় ‘গুরজুফ ডিফেন্স’ নামের একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি ভারী মাল বহনে সক্ষম ছয় পাখার ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়। ড্রোনটি প্রায় ৯০ কেজি ওজন বহন করে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্ধার অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে ভ্লাসেনকোর কাছে বিশেষ হারনেস ও নির্দেশনাসহ একটি ফোন পাঠানো হয়। ৪ অক্টোবর তিনি ওই হারনেসের সাহায্যে ড্রোনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এরপর ড্রোনটি তাঁকে প্রায় ৭০ মিটার উঁচুতে তুলে নিরাপদ স্থানের উদ্দেশে উড়াল দেয়।

অভিযানের সময় আরও তিনটি ড্রোন উদ্ধারকারী ড্রোনটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল। পাশাপাশি ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে রুশ অবস্থানের দিকে গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখে।

প্রায় ১৫ মিনিটের আকাশযাত্রা শেষে ভ্লাসেনকোকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের খারকিভ শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো জানান, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগে একসময় তাঁর মনে হয়েছিল বেঁচে ফেরার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ড্রোনে ঝুলে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি রসিকতা করে বলেন, মাটিতে বা বনে পড়ে যাওয়ার ভয় তাঁর ছিল না; ভয় ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া নিয়ে, কারণ তিনি সাঁতার জানেন না।

যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সেনাকে ভারী ড্রোনের সাহায্যে সরিয়ে নেওয়ার এ অভিযান আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের বহুমুখী ব্যবহারের নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts