নিউজ প্রবাসী ডেক্স:

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের ব্যবহারকারীদের অবস্থান শনাক্ত ও অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিসকভার-টেকের বিরুদ্ধে। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের শতাধিক দেশে স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন নিলামে সক্রিয় ছিল।

জাপানভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ড মাইক্রোর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডএআইয়ের গবেষণায় এ ধরনের কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছয়টি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্পেসএক্সের স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ডিসকভার-টেক অন্যতম সক্রিয় প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিল। বিজ্ঞাপন নিলামে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ব্রাউজার ও অ্যাপে বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ট্রেন্ডএআই গত ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম সরাসরি উল্লেখ করেনি। সেখানে ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’ ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়। সূত্রগুলোর দাবি, এটি ডিসকভার-টেকের জন্য ট্রেন্ডএআইয়ের নির্ধারিত সাংকেতিক নাম।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে স্টারলিংক-সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন নিলামে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ দরদাতাদের মধ্যে ছিল। এমন কিছু দেশেও তাদের কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে স্টারলিংক সেবা নিষিদ্ধ কিংবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

বিজ্ঞাপন নিলামের তথ্য দিয়ে নজরদারির অভিযোগ

একই দিনে কানাডার সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাব এবং নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কনফিয়েন্ট সরাসরি ডিসকভার-টেকের নাম প্রকাশ করে। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন নিলাম ব্যবস্থার অপব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করেছিল।

বিজ্ঞাপন নিলামে অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে কিছু তথ্য পৌঁছে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে এসব তথ্য অন্য উৎসের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহারকারীর পরিচয় ও অনলাইন কার্যক্রম শনাক্ত করা সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে এভাবে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নজরদারির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার ঝুঁকিও রয়েছে।

সিটিজেন ল্যাব ও কনফিয়েন্টের দাবি, গণমাধ্যম, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানির মতো সংবেদনশীল নেটওয়ার্কেও এসব বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়েছিল। অভিযোগ সামনে আসার পর গুগল, কমকাস্টসহ কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে ডিসকভার-টেককে সরিয়ে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নিজেদের কর্মীরা এ ধরনের বিজ্ঞাপনভিত্তিক নজরদারির শিকার হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতেও বিজ্ঞাপন কেনার অস্বাভাবিক প্রবণতা

ট্রেন্ডএআইয়ের প্রতিবেদনে সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ও দক্ষিণ সুদানে ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’-এর বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন কেনার তথ্য উঠে এসেছে। আফগানিস্তানেও প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় বৃহত্তম বিজ্ঞাপন ক্রেতা ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

গবেষকদের মতে, এসব দেশের কয়েকটিতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাতের কারণে বৈধ বাণিজ্যিক পণ্যের বিজ্ঞাপনের স্বাভাবিক চাহিদা খুবই সীমিত। তাই সেখানে বিপুল বিজ্ঞাপন কেনার প্রবণতাকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখা হয়েছে। হাঙ্গেরি, ইসরায়েল, মিসর, আজারবাইজান ও ভেনিজুয়েলাতেও প্রতিষ্ঠানটির অস্বাভাবিক প্রাধান্য দেখা গেছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রেন্ডএআইয়ের গবেষকেরা বিজ্ঞাপন নিলামের এসব কার্যক্রমের সঙ্গে ডিসকভার-টেকের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন। তবে আইনি জটিলতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের নাম প্রতিবেদনে প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ট্রেন্ডএআই জানিয়েছে, ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি এড়ানো এবং অযথা আলোড়ন সৃষ্টি না করার নীতির কারণে তারা প্রতিবেদনে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে। তবে ডিসকভার-টেক ও এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে রয়টার্সের বক্তব্য চাওয়ার পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। স্পেসএক্সও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

স্টারলিংক ঘিরে নজরদারির ঝুঁকি

স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ায় স্টারলিংক অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে কিছু দেশে ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা বা সেন্সরশিপ এড়িয়ে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ ও সমন্বয়েও এ সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এর আগে চলতি বছরের মে মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎস ও ওয়েবসাইট ইন্টেলিজেন্স অনলাইন পৃথক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ইসরায়েলি মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অনুসরণের কৌশল বিক্রি করছে। এসব প্রতিবেদনে বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া তথ্যকে নজরদারির অন্যতম উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ব্যবহারকারী-তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ থাকায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগগুলো বিজ্ঞাপন প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদারের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts