নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
নির্বাচনি প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার কীভাবে রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার প্রচারাভিযান। ‘লুলার আর্মি’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ডিজিটাল প্রচার কার্যক্রম লুলার পুনর্নির্বাচনের প্রচারে নতুন গতি এনেছিল বলে মনে করছেন তাঁর সমর্থকেরা।
চ্যানেলটির অনুসারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি আট লাখে। কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেসের নেতৃত্বে পরিচালিত এ উদ্যোগে সমর্থকদের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, হ্যাশট্যাগ জনপ্রিয় করা এবং নতুন ভোটারদের কাছে প্রচারের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত করা হয়।
নির্বাচনি লড়াইয়ের একপর্যায়ে ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বোলসোনারোর তুলনায় পিছিয়ে ছিলেন লুলা। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। লুলার সমর্থকেরা এ ঘটনাকে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন। তবে এ সাফল্যের পেছনে হোয়াটসঅ্যাপের ভূমিকা কতটা ছিল, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে।
সমর্থকদের কাজে লাগানোর নতুন কৌশল
‘লুলার আর্মি’র মূল লক্ষ্য ছিল শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার নয়, বরং সমর্থকদের অনলাইন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা। চ্যানেলে বিভিন্ন নমুনা বার্তা ও প্রচারসামগ্রী দেওয়া হতো, যা অনুসারীরা সহজেই বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতেন। কখনো নতুন ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হতো, আবার কখনো নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ জনপ্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হতো।
আন্দ্রে জানোনেস নিয়মিত সমর্থকদের সর্বশেষ নির্বাচনি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাতেন। তাঁর বার্তায় ছিল জরুরি নির্দেশনা ও প্রচারণার উদ্দীপনা। সমর্থকদের আরও বেশি সময় অনলাইনে সক্রিয় রাখতেও তিনি নানা ধরনের আহ্বান জানাতেন।
নির্বাচনের আগের দিনও এ প্রচার থামেনি। জানোনেস টানা ২৪ ঘণ্টার একটি সরাসরি সম্প্রচার আয়োজন করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘টার্নঅ্যারাউন্ড লাইভস্ট্রিম’। সে সময় জনমত জরিপে বোলসোনারোর জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্ষণশীলদের আধিপত্যের জবাব
ব্রাজিলের রাজনীতিতে হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব নতুন নয়। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর সমর্থক রক্ষণশীলরা দীর্ঘদিন ধরে এসব মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রচারে সক্রিয় ছিলেন। ২০১৮ সালে বোলসোনারোর নির্বাচনি জয়ের পর দেশটির রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এ প্রেক্ষাপটে ‘লুলার আর্মি’র উত্থানকে লুলার সমর্থকেরা ডিজিটাল প্রচারে বামপন্থিদের শক্তিশালী উপস্থিতির নিদর্শন হিসেবে দেখছেন। তবে জানোনেসের আক্রমণাত্মক অনলাইন প্রচার কৌশল নিয়ে লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির ভেতরেও কিছুটা উদ্বেগ ছিল। দলের কয়েকজন সদস্য মনে করতেন, এ ধরনের প্রচার লুলার তুলনামূলক মধ্যপন্থি ভাবমূর্তির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নির্বাচনে জয়ের পর অবশ্য জানোনেসের ভূমিকার প্রশংসা করেন লুলা। বিজয় ভাষণে তাঁকে ‘আমাদের জেনারেল’ বলে উল্লেখ করেন এবং প্রতিদিন সমর্থকদের উজ্জীবিত রাখার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
শুধু অনলাইন প্রচারেই কি বদলায় ভোটের হিসাব?
‘লুলার আর্মি’র জনপ্রিয়তা নির্বাচনে লুলার জয়ের পেছনে কতটা ভূমিকা রেখেছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিমাপ করা কঠিন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার দেখে কতজন ভোট দিয়েছেন কিংবা কতজন ভোটারের সিদ্ধান্ত বদলেছে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ডেনিলদে হোলজ্যাকার মনে করেন, লুলার ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে প্রচার কৌশলে পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর মতে, লুলার শিবির অনলাইনে সমর্থকদের সক্রিয় রাখার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জনসংযোগও জোরদার করে।
প্রচারের বার্তাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছিল। বোলসোনারো ক্ষমতায় এলে সামাজিক কর্মসূচিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন এবং মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কার মতো বিষয় সামনে আনা হয়। হোলজ্যাকারের মতে, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রচারের ধরন বদলে নেওয়া ছিল লুলার কৌশলগত সাফল্য। একই সঙ্গে জানোনেস ব্রাজিলের বামপন্থিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
অন্যদিকে, হোলজ্যাকারের ধারণা, ফ্লাভিও বোলসোনারো দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে নিজের জয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ফলে সমর্থকদের কাছে নিজের বার্তা লুলার মতো কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে পারেননি।
রিও ডি জেনেইরোর ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী-রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মাইরা গুলার্তও মনে করেন, লুলার বিজয়কে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, অনলাইন প্রচারের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং ভোটারদের সংগঠিত করার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
গুলার্তের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল প্রচার ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতা একসঙ্গে কাজ করায় ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সমর্থন আদায় এবং ভোট না দেওয়ার প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রেও এ সমন্বিত উদ্যোগ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।
অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার জনপ্রিয় হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটে রূপ নেয় না। অনলাইনে তৈরি হওয়া আগ্রহকে বাস্তব রাজনৈতিক অংশগ্রহণে পরিণত করাই ছিল লুলার শিবিরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকার পরিচালনাতেও গুরুত্ব পেতে পারে ডিজিটাল যোগাযোগ
নির্বাচনি প্রচারে ডিজিটাল যোগাযোগের অভিজ্ঞতা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে চান লুলা। বিজয় ভাষণে তিনি বলেন, নির্বাচন থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে এবং দেশ পরিচালনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দেন।
লুলার বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত জানানোর সুযোগ আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি তাঁর সরকারে ডিজিটাল যোগাযোগের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রচারেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে অনলাইন প্রচারের সঙ্গে সরাসরি জনসম্পৃক্ততা কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, তার ওপর।
সব মিলিয়ে ‘লুলার আর্মি’ দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত প্রচার সমর্থকদের সক্রিয় করতে এবং রাজনৈতিক বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু নির্বাচনি ফলাফলে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে অনলাইন কার্যক্রমের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের প্রচার, ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।