নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রস্তাবিত গোপনীয়তা আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই শুরু করেছে দেশটির শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। আইনটি কার্যকর হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে এবং অনেক সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রকাশকেরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসহ ২১টি সংবাদ প্রকাশনা সংস্থার একটি জোট আইনটির কয়েকটি বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি বিধান, যার আওতায় কারও বিষয়ে সংবাদ বা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, এ ধরনের নিয়ম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। দুর্নীতি, অপরাধ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই সেই সংবাদ প্রকাশে সম্মতি না-ও দিতে পারেন।
প্রকাশকদের মতে, এভাবে সংবাদ প্রকাশের আগে অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা কার্যত পূর্ব-সেন্সরশিপের ব্যবস্থা তৈরি করবে।
সংবাদকক্ষ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনটি কার্যকর হলে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে তথ্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে। এতে শুধু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নয়, সংবাদমাধ্যমের নিয়মিত কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএনপিএ) পক্ষে আইনজীবী মাধবী গোরাডিয়া দিভান আদালতকে বলেন, আইনটি সংবাদ প্রকাশের মৌলিক ধারণাকেই পরিবর্তন করে দিচ্ছে। সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি নিতে হলে সংবাদকক্ষগুলোর কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
দিভান জানান, আইনের আগের খসড়াগুলোতে সাংবাদিকদের জন্য কিছু ছাড়ের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত সংস্করণে সেসব ছাড় বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সংবাদ প্রকাশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গোপন সূত্রের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
প্রকাশকদের আশঙ্কা, নতুন আইনের মাধ্যমে সরকার সাংবাদিকদের তথ্যের গোপন উৎস শনাক্ত করার সুযোগ পেতে পারে। পাশাপাশি পুরোনো সংবাদ ও প্রতিবেদন মুছে ফেলার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে গোপন সূত্রের তথ্য অনেক সময় দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংবাদদাতার পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকি থাকলে তথ্যদাতারা সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রকাশের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রকাশকেরা।
তাদের বক্তব্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যের মতো কয়েকটি অঞ্চলে সাংবাদিকদের জন্য যে ধরনের সুনির্দিষ্ট ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে, ভারতের আইনটিতে তেমন লিখিত সুরক্ষা রাখা হয়নি। এ বিষয়টি সংবাদমাধ্যমগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রথমবার একসঙ্গে বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর আইনি লড়াই
মোদী সরকারের এই আইনের বিরোধিতা আগে বাকস্বাধীনতাকর্মী ও কয়েকটি ছোট সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এবারই প্রথম দেশের বড় বড় সংবাদ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে আদালতে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিএনপিএর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে আম্বানির মালিকানাধীন নেটওয়ার্ক১৮, আদানি গোষ্ঠীর এনডিটিভি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান টাইমস ইন্টারনেট।
প্রকাশকদের সংগঠন আইনটির বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, আইনটি ২০২৭ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকায় এর আগেই আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্ট মামলাটির পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী মাসে দিন ধার্য করেছে। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে প্রকাশকেরা আরও জানিয়েছেন, গত আগস্টে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ভারতের ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। তবে মোদী সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী বলে জানিয়েছে।
নতুন গোপনীয়তা আইন ঘিরে বিতর্কের মধ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার নামে এমন কোনো বিধান কার্যকর করা উচিত নয়, যা দুর্নীতি ও অনিয়ম অনুসন্ধান কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এখন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেশটির সংবাদ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো।