নিউজ প্রবাসী ডেক্স:

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ায় ইউনিটটির ‘স্টেজ-সি’ বা পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের আশা, নির্ধারিত পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসান জানান, বায়েরার চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন।

এর আগে ইউনিটটির বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রাক্‌-প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা ও কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এসব পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়ার পর স্টেজ-সি পর্যায়ে প্রবেশের অনুমোদন দেওয়া হয়।

পরীক্ষায় গুরুত্ব পাবে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা

পাওয়ার স্টার্টআপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। রিঅ্যাক্টর, কুল্যান্ট ব্যবস্থা, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে কি না, তা নিবিড়ভাবে যাচাই করা হবে।

এ পর্যায়ে সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। বিশেষ করে টারবাইনের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা, জেনারেটর এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্বাভাবিক অবস্থায় যথাযথভাবে কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।

রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা প্রাথমিকভাবে কম রেখে পরীক্ষা শুরু হবে। কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানো হবে। রিঅ্যাক্টরের তাপীয় ক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এই সময়সীমা পরীক্ষার ফলাফল, কমিশনিং কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে।

পরীক্ষামূলক সরবরাহ মানেই বাণিজ্যিক উৎপাদন নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন, জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু—তিনটি আলাদা ধাপ। পরীক্ষামূলক সরবরাহ শুরু হলেও কেন্দ্রটির বিভিন্ন কারিগরি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই চলবে। বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে হলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, কমিশনিং কার্যক্রম এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব শর্ত পূরণ করতে হবে।

এ প্রক্রিয়ায় বায়েরা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থা এবং নিরাপত্তা ও পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে।

প্রকল্পটি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের মূল মেয়াদ প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও পরে দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং অন্যান্য আর্থিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে বর্তমানে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে অগ্রগতি হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে কি না, তা নির্ভর করছে আসন্ন পরীক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত পূরণের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts