নিউজ প্রবাসী ডেক্স:

পদ্মা নদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পের আওতায় চার বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারেন বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক সময়ে তা নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করা যাবে। এতে সেচের পানির সংকট কমার পাশাপাশি নদ-নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা মিলতে পারে। তবে এসব সুফল পেতে প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়ন ও পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দাবি, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে বছরে মাছের উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, পলি জমা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের সমস্যা। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় কৃষি সেচ, নৌ চলাচল ও মৎস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করতে না পারায় বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব কারণে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বাসসকে জানান, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে চলছে। এ জন্য পানি ভবনে আলাদা কার্যালয় করা হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুর এবং ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চার বিভাগের ১৯ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। পাশাপাশি কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের জন্য সরকার ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। পুরো অর্থায়ন সরকারি তহবিল থেকে করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে কাজ শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ। প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পেও এর মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার। পাশাপাশি খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো, সুন্দরবনে মিঠাপানির সরবরাহ বাড়ানো, ভবদহসহ বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয় ও আর্সেনিক দূষণ কমানোর বিষয়ও প্রকল্পে গুরুত্ব পেয়েছে।

বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন মনে করেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, প্রকল্পটি নদীব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং পানি ও মাটির লবণাক্ততা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে নির্মাণের সময় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী ও পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামও প্রকল্পটিকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি, কৃষি, নৌ চলাচল ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দীর্ঘদিনের পানিসংকট, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো সমস্যা মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজকে বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের ঘোষিত সুফল কতটা বাস্তবে অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে নির্মাণকাজের মান, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts