আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে বড় বিনিয়োগে নির্মিত নাদোর ওয়েস্ট মেড বন্দর কমপ্লেক্সের প্রথম কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু করেছে মরক্কো। দেশটির উত্তরাঞ্চলের নাদোর প্রদেশের ইয়াজানেন এলাকায় শনিবার (৩১ অক্টোবর) ‘ইস্ট’ টার্মিনালটির উদ্বোধন করেন ক্রাউন প্রিন্স মুলায় হাসান। রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের নির্দেশনায় এ কার্যক্রম শুরু হয়।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রায় ৫৪০০ কোটি দিরহাম বিনিয়োগে গড়ে উঠছে পুরো বন্দর কমপ্লেক্সটি। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি চালু হলে মরক্কোর বন্দর অবকাঠামো, শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে।

প্রায় ৫০০ কোটি দিরহাম ব্যয়ে নির্মিত ইস্ট টার্মিনালের জেটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৫২০ মিটার। ১৮ মিটার গভীরতার এ টার্মিনালে ৭০ হেক্টর এলাকায় কনটেইনার সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৩৫ লাখ কনটেইনার ওঠানামার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। টার্মিনালটি ২৫ বছর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে মরক্কোর প্রতিষ্ঠান মারসা মারোক এবং এমএসসি গ্রুপের সহযোগী টার্মিনাল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগ।

কমপ্লেক্সে ‘ওয়েস্ট’ নামে আরেকটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণাধীন। প্রায় ৩০০ কোটি দিরহাম ব্যয়ে নির্মিতব্য এ টার্মিনালের জেটি হবে ৯০০ মিটার দীর্ঘ এবং কনটেইনার রাখার জায়গা থাকবে ৩৮ হেক্টরজুড়ে। বছরে ১৮ লাখ কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতাসম্পন্ন টার্মিনালটি ২০২৭ সালের এপ্রিলে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এটি পরিচালনা করবে মারসা মারোক ও সিএমএ সিজিএমের যৌথ উদ্যোগ। দুটি টার্মিনাল চালু হলে বন্দরের সম্মিলিত কনটেইনার ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা দাঁড়াবে বছরে ৫৩ লাখে।

কনটেইনারের পাশাপাশি সাধারণ পণ্য ও বাল্ক কার্গো পরিবহনের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। ২২ হেক্টর এলাকাজুড়ে নির্মিত সাধারণ পণ্য টার্মিনালে বছরে ৩০ লাখ টন পণ্য পরিচালনা করা যাবে। ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, বছরে ৭০ লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাসম্পন্ন বাল্ক কার্গো টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য ২০২৭ সালের জুন। যানবাহন পরিবহনের জন্য নির্মিত রোল-অন রোল-অফ টার্মিনালের সক্ষমতা হবে চার লাখ ইউনিট। ৩৮০ মিটার জেটির এ স্থাপনাটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বন্দর কমপ্লেক্সে জ্বালানি খাতের অবকাঠামোও যুক্ত হচ্ছে। সেখানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এর সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে বছরে ৫০০ কোটি ঘনমিটার। পাশাপাশি বছরে ২ কোটি ৫০ লাখ টন হাইড্রোকার্বন ব্যবস্থাপনার উপযোগী আরেকটি টার্মিনাল গড়ে তোলা হচ্ছে। তিনটি ১২৫ মিটার জেটি নিয়ে নির্মিত এ জ্বালানি অবকাঠামো ২০২৭ সালের এপ্রিলে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিও প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে বন্দর কমপ্লেক্সে সরাসরি ১৪ হাজার এবং পরোক্ষভাবে ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটির সরকার। এ ছাড়া ৭০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে শিল্প ও লজিস্টিকস কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি দিরহাম বিনিয়োগ আসার প্রত্যাশা রয়েছে। নতুন শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বন্দরটির সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ বাড়াতে রেল ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। সেলুয়ান থেকে নাদোর ওয়েস্ট মেড পর্যন্ত ৪৯ কিলোমিটার রেলপথ এবং গেরসিফ শহর থেকে ১০৫ কিলোমিটার মহাসড়ক সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব যোগাযোগব্যবস্থা চালু হলে আশপাশের শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চলের সঙ্গে বন্দরের সংযোগ আরও সহজ হবে।

মরক্কোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, নাদোর ওয়েস্ট মেড ভূমধ্যসাগর, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রবাণিজ্যে দেশটির অংশগ্রহণ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। বিদ্যমান তাঞ্জের মেড বন্দরের পরিপূরক হিসেবে এটি গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বন্দর অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প, সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

এদিকে আটলান্টিক উপকূলে ডাকলা আটলান্টিক প্রকল্পের মাধ্যমেও আফ্রিকায় বাণিজ্যিক অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে মরক্কো। বিশেষ করে সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এ প্রকল্পের মাধ্যমে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts