নিউজ প্রবাসী ডেক্স :

গত ১০ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০১৫ সালে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৩৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১০ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৯২ শতাংশ। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি আসল ও সুদ পরিশোধের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ ৫১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৯১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে ঋণের স্থিতি ১১৩ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে।

দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ঋণ সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। ২০১৫ সালে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এক দশকে এই ঋণ বেড়েছে সাড়ে সাত গুণের বেশি।

একই সময়ে বহুপক্ষীয় ঋণ ২০ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৫ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ১১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আইএমএফের ঋণও ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

ঋণ পরিশোধে বাড়ছে চাপ

ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ ও আসল পরিশোধের ব্যয়ও বেড়েছে। ২০১৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদ বাবদ বাংলাদেশকে ৩৩১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল। ২০২৫ সালে এ খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে।

অন্যদিকে, একই সময়ে ঋণের আসল পরিশোধ ১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ৭ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে, তার দ্বিগুণ অর্থ আগের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বাজেটের বড় অংশ চলে যাচ্ছে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার কয়েকটি সূচকেও অবনতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৫ সালে দেশের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশের সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে ২৫ শতাংশে নেমেছে। জাতীয় আয় ও রপ্তানি আয়ের তুলনায় ঋণের অনুপাতও বেড়েছে।

বিশ্বজুড়েই ঋণের বোঝা বাড়ছে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। উচ্চ সুদের কারণে দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ)-ভুক্ত দেশগুলোর ঋণ ৮ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালে এসব দেশকে নতুন বেসরকারি ঋণে গড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং বন্ডে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ সুদ দিতে হয়েছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এ ছাড়া নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো ওই বছর ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন অর্থায়নের তুলনায় ৪৩৬ বিলিয়ন ডলার বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে। দুর্বল মার্কিন ডলারের কারণে অন্যান্য মুদ্রায় নেওয়া ঋণের ডলারভিত্তিক হিসাবও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts