নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রীর দাম বাড়ায় ক্রমেই চাপে পড়ছেন সীমিত আয়ের মানুষ। সংসারের খরচ সামলাতে অনেক পরিবার মাছ-মাংস, দুধ, ফলসহ পুষ্টিকর খাবারে কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে। বাজারের লাগামহীন ব্যয়ের সঙ্গে আয় সমন্বয় করতে না পেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও হতাশা।
রাজধানীর পুরান ঢাকার বাসিন্দা সায়েদুল হক জানান, বিয়ের দেড় বছরের মধ্যেই সংসারের বাড়তি খরচ তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্র পড়ানো ও স্ত্রীর চাকরির আয়ে সংসার চালালেও মাসের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তার অভিযোগ, কয়েক মাসের ব্যবধানে বিদ্যুৎ, এলপিজি গ্যাস এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পেছনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে এক হাজার টাকার বিদ্যুৎ রিচার্জে এক মাসের বেশি চললেও এখন অনেক কম সময়েই সেই টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতেও আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।
শুধু জ্বালানি নয়, কাপড় ধোয়ার পাউডার, সাবান ও শ্যাম্পুসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের দামও বেড়েছে। ফলে অনেকেই পরিচিত ও তুলনামূলক দামি ব্র্যান্ডের পরিবর্তে কম দামের পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, অনেক পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ানোর পাশাপাশি একই দামে প্যাকেটের ওজন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘শ্রিংকফ্লেশন’। এতে পণ্যের গায়ে একই দাম লেখা থাকলেও বাস্তবে ক্রেতারা কম পণ্য পাচ্ছেন।
সীমিত আয়ের পরিবারগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে খাদ্য ব্যয়ে। রাজধানীর একটি বীমা কোম্পানির চাকরিজীবী কবির আহমেদ জানান, মাসের বাজারের তালিকা থেকে এখন একে একে বাদ দিতে হচ্ছে মাছ-মাংস ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার।
তার ভাষায়, আগে বাজারে গিয়ে পরিবারের জন্য কী কী খাবার কেনা যায়, তা নিয়ে ভাবতেন। এখন ভাবতে হয়—কোন কোন পণ্য বাদ দিলে মাসের খরচ সামলানো সম্ভব হবে। সন্তানদের পছন্দের খাবারও অনেক সময় দামের কারণে কিনে দিতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
বাজারে চাল, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ, ডিম, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দামে ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ পরিস্থিতি ও কয়েক দফা হাতবদলের কারণে অনেক পণ্যের দাম বাড়ছে।
সরকারি হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। তবে সাধারণ ভোক্তাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হলেও বাজারে গিয়ে স্বস্তি মিলছে না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হলে একদিকে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ—কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদ মনে করেন, খাদ্য ও জ্বালানিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে পর্যাপ্ত মজুত বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় সরবরাহ সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় এবং দৈনন্দিন খরচের চাপে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত স্বস্তি ফিরিয়ে আনা হবে।