নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
বছরে ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা; তিন বছরে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আশা
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়ার চরে দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিতব্য এ টার্মিনালে বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।
রোববার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, লালদিয়া টার্মিনাল দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বড় ধরনের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের বিনিয়োগের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, নতুন টার্মিনালটিতে আধুনিক সুবিধার পাশাপাশি বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করেই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়। চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কার্যকর ব্যবসানীতি এবং উন্নত লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ বাড়লে শহরটি স্বাভাবিকভাবেই দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ডেনমার্কের মেয়ার্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস গত বছরের ১৭ নভেম্বর লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার চুক্তি করে। পরে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমি প্রতিষ্ঠানটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। টার্মিনাল চালু হওয়ার পর ৩০ বছর এটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও বাড়ানোর সুযোগও থাকবে।
বাংলাদেশে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত—এমন একটি শক্তিশালী বার্তা বিশ্বে পৌঁছাবে।
এপিএম টার্মিনালসের প্রধান নির্বাহী রমেশ ডেভিড বলেন, প্রকল্পটি বাংলাদেশে একাধিক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। এটি দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল, বড় ধরনের পিপিপি প্রকল্প এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিশ্বব্যাপী বন্দর ব্যবস্থাপনা দ্রুত আধুনিকায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় সময়োপযোগী প্রযুক্তি গ্রহণের বিকল্প নেই।
তিনি জানান, লালদিয়া টার্মিনাল ২৪ ঘণ্টা সচল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি চালু হলে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ানো জাহাজের তুলনায় বড় ধারণক্ষমতার কনটেইনারবাহী জাহাজও এখানে ভেড়াতে পারবে।
নির্মাণ শেষ হলে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফট এবং প্রায় ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ টার্মিনালটিতে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর তুলনায় লালদিয়া টার্মিনালের অবস্থান সাগরমোহনার কাছাকাছি। ফলে নদীর বাঁক অতিক্রম না করেই তুলনামূলক কম সময়ে বড় জাহাজ টার্মিনালে পৌঁছাতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
প্রকল্পের মূল টার্মিনাল এলাকা হবে ৩২ একর জমিতে। এর সঙ্গে কনটেইনার ইয়ার্ড, ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধাসহ মোট আয়তন দাঁড়াবে প্রায় ৪৯ দশমিক ১৫ একর। ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটিতে বছরে ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রকল্পটিতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে, যা দেশের অন্যতম বড় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, নতুন টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়বে। পণ্য খালাসে সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি বড় আকারের জাহাজ চলাচলও সহজ হবে।
তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দর টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বন্দর রক্ষার দাবিতে আন্দোলনকারীদের একাংশের দাবি, একের পর এক টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের হাতে গেলে ভবিষ্যতে বন্দর ব্যবস্থাপনায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও দেশের কৌশলগত সক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তারা এ ধরনের চুক্তি জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড কনটেইনার টার্মিনালটি কার্যক্রম শুরু করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts