নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
ঢাকার ধানমণ্ডিতে মুস্তাফা মনোয়ারের বাসভবনের একটি কক্ষ আজও ধরে রেখেছে তাঁর শিল্পসৃষ্টির স্মৃতি। ঘরজুড়ে ছড়িয়ে আছে অর্ধশতাধিক পাপেট, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও তৈরির সরঞ্জাম। কোথাও শিশু, বৃদ্ধ কিংবা পশু-পাখির মুখ; আবার কোথাও অসম্পূর্ণ পড়ে আছে কোনো পাপেটের শরীর।
নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে নিজের বাসাতেই এই ‘পাপেট বাড়ি’ গড়ে তুলেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। সেখানে ৫১টি সম্পূর্ণ এবং প্রায় ৩০টি অসম্পূর্ণ পাপেট রয়েছে। একটি ঘরে এখনও সংরক্ষিত আছে তাঁর ব্যবহৃত ছেনি, তুলি, রঙের কৌটা, সেলাইয়ের সরঞ্জাম, কাঠ কাটার যন্ত্র ও পুরনো লেদ মেশিন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত ২৯ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যান এই সব্যসাচী শিল্পী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তবে তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর হাতে গড়ে ওঠা পাপেটগুলো যেন অপেক্ষা করছে নতুন কোনো সৃষ্টির।
মুস্তাফা মনোয়ারের সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র ‘পারুল’ কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। শিক্ষামূলক পাপেট অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’র মাধ্যমে তিনি শিশুদের কাছে ‘শিল্পী ভাই’ নামে পরিচিতি পান।
‘পারুল’ চরিত্রে কাজ করা তামান্না তিথি বলেন, পারুল ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের ভাবনার জীবন্ত প্রকাশ। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিবাচক বিষয়গুলো শিশুদের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা।
তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও ‘বাউল’ চরিত্রের শিল্পী অনুকূল দাস জানান, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, শিল্পী ছিলেন অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ এবং কোনো কাজ মনমতো না হলে সেটি আবার নতুন করে করতেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের একটি বড় স্বপ্ন অবশ্য অপূর্ণই থেকে গেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ কবিতা অবলম্বনে পাপেট ও মানুষের যৌথ অভিনয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। চিত্রনাট্য ও চরিত্র তৈরির কাজ অনেকটা এগোলেও অসুস্থতার কারণে তা শেষ করতে পারেননি।
পাপেটশিল্পী সোহেল বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের কাছ থেকে শেখা শিল্পকে তাঁরা থামতে দিতে চান না। তাঁর তৈরি পাপেট ও কাজের ধারাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন তাঁরা।
মুস্তাফা মনোয়ারের ছেলে সাদাত মনোয়ারও তাঁর বাবার সৃষ্টি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানান, পাপেটগুলোর কিছু অংশ উপযুক্ত জাদুঘরে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি এগুলো তৈরির কৌশল নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে পাপেট শিল্পের বিকাশে মুস্তাফা মনোয়ারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচে আকৃষ্ট হয়ে পরে তিনি পাপেট শিল্পকে নতুন রূপ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতেও তিনি পাপেট শোর আয়োজন করেছিলেন।
তাঁর সৃষ্ট ‘পারুল’, ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’সহ বিভিন্ন চরিত্র আজও মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে। শিল্পীর মৃত্যু হলেও তাঁর তৈরি পাপেট ও অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোকে ঘিরে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন তাঁর শিষ্যরা।