নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব মূল্যায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চালু করা উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও কয়েকজন শিক্ষক। তাদের প্রশ্ন, শিক্ষক মূল্যায়নের এখতিয়ার ডাকসুকে কে দিয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বা শিক্ষক হয়রানির ঝুঁকি তৈরি হবে কি না।
বৃহস্পতিবার ডাকসু ‘শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি’ চালু করে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মতামত দেওয়ার জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মও চালু করা হয়। ডাকসুর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।
উদ্যোগ চালুর পর এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬টি বিভাগের ২ হাজার ৪৫ জন শিক্ষককে নিয়ে ৬ হাজার ৬১৫ জন শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করেছেন। এতে কোনো কোনো শিক্ষক পাঁচের মধ্যে পাঁচ এবং কেউ কেউ এক বা দুই রেটিং পেয়েছেন।
তবে ডাকসুর এই উদ্যোগকে এখতিয়ারবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং সেটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি জানান, ২০২২ সালে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু হলেও কোভিড পরিস্থিতির কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেটি নতুন করে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডাকসুর চালু করা পদ্ধতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বসে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর গঠনতন্ত্রে কোনো দায়িত্ব নির্ধারিত নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এর আগে ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের নীতিমালা তৈরি করা হয়। পরে ২০২৪ সালে ‘লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষক মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট সেমিস্টারে অন্তত ৭০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সম্পর্কে মতামত দিতে পারতেন।
ডাকসুর বর্তমান পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষকদের একটি বড় প্রশ্ন হলো—একজন শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ক্লাস না করেও মূল্যায়ন বা মন্তব্য করার সুযোগ পাচ্ছেন। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আসিফ হোসেন খান এ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন।
ওয়েবসাইটে মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখার বিষয়টিও প্রশ্ন তুলেছে। সাবেক আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক আসিফ হোসেন খানের মতে, পরিচয় গোপন থাকলে মূল্যায়নগুলো প্রকৃত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই এসেছে কি না, তা নিশ্চিত করার উপায় নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
এদিকে কয়েকজন শিক্ষক মনে করছেন, অনলাইনে শিক্ষকদের প্রকাশ্য রেটিং ও মন্তব্যের কারণে হয়রানি এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মাইনুল ইসলামও শিক্ষক মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমেই হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে ডাকসুর নেতারা বলছেন, শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্দেশ্য কোনো শিক্ষককে হেয় করা নয়; বরং পাঠদানের মান বাড়ানো এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষকদের গড়িমসি জবাবদিহিতার মধ্যে আনার পাশাপাশি দায়িত্বশীল শিক্ষকদের উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।
ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দীন খান বলেন, উদ্যোগটির লক্ষ্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা নয়; পাঠদানের মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের মতামত জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ জানান, এটি আপাতত এক মাসের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। এ সময় যেসব সমস্যা বা প্রশ্ন উঠবে, সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কার্যকরভাবে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করলে ডাকসু তাদের উদ্যোগ বন্ধ করে দেবে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts