নিউজ প্রবাসী ডেস্ক   :

যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে পাথরের প্রাচীন সমাধি থেকে উদ্ধার হওয়া একটি কঙ্কালের পরিচয় শনাক্ত করার দাবি করেছেন এক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক। তাঁর ধারণা, কঙ্কালটি কোনো রোমান নাগরিকের নয়; বরং মধ্যযুগে বসবাসকারী একজন উচ্চপদস্থ ধর্মযাজকের। তবে মৃত ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট পরিচয় এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুনাপাথরে তৈরি সার্কোফেগাস বা পাথরের কফিনটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৮২০ সালে। পরে ১৮৬৯ সালে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির বর্তমান নেভের উত্তর পাশের ঘাসে ঢাকা এলাকা থেকে এটি খনন করে তোলা হয়। তখন থেকেই এর ভেতরে থাকা ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

সার্কোফেগাসটি চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকের রোমান আমলের বলে ধারণা করা হয়। এর গায়ে রোমান নকশার পাশাপাশি ‘ভালেরিয়াস আমান্দিনুস’ নামের একটি লাতিন শিলালিপিও রয়েছে। তবে আশপাশের এলাকায় পরবর্তী খননকাজে রোমান আমলের প্রত্নবস্তু না পাওয়ায় কফিনটির প্রকৃত অবস্থান ও ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়।

ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির পরামর্শক প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক ওয়ারউইক রডওয়েলের মতে, পাথরের কফিনটি তার মূল সমাধিস্থলে ছিল না। তাঁর ধারণা, এটি আগে কোনো সমাধির দেয়ালের কুলুঙ্গিতে রাখা হয়েছিল। কফিনের ঢাকনায় খোদাই করা বড় ক্রুশচিহ্নও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রডওয়েলের মতে, এটি পরবর্তী সময়ে ঢাকনাটিতে যুক্ত করা হয়েছিল এবং এর ধরন শেষ অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

২০১৮ সালে ‘কুইনস ডায়মন্ড জুবিলি’ গ্যালারিতে প্রদর্শনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কফিনটি নিয়ে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এ সময় এর ঢাকনা খোলার পর ভেতরে কঙ্কালটির সন্ধান পাওয়া যায়। নথিপত্রে দেহাবশেষটি হারিয়ে গেছে বলে উল্লেখ থাকায় আবিষ্কারটি গবেষকদের বিস্মিত করে।

পরীক্ষায় দেখা যায়, কঙ্কালটি আনুমানিক ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার এবং মৃত্যুকালে ওই ব্যক্তির বয়স ছিল ৩৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। কঙ্কালের হাড়ের ধরন উনিশ শতকে হাতে আঁকা একটি ছবির সঙ্গে মিলে গেছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

কফিনের ভেতরের অংশ পরিষ্কার করার সময় মেঝের মতো স্থানে সাদা পদার্থ দিয়ে তৈরি আয়তাকার একটি রেখাও পাওয়া যায়। রডওয়েলের ব্যাখ্যা, মৃতদেহটি কাঠের কফিনে রেখে তার ওপর চুনের গুঁড়া দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই কাঠের কফিনটি প্রাচীন রোমান সার্কোফেগাসের ভেতরে স্থাপন করা হয়।

হাড়ের রেডিওকার্বন পরীক্ষায় দেহাবশেষের সময়কাল দশম শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে একাদশ শতাব্দীর শুরুর দিক বলে ধারণা পাওয়া গেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে রডওয়েল মনে করছেন, মৃত ব্যক্তি সম্ভবত মধ্যযুগের একজন প্রভাবশালী ধর্মযাজক ছিলেন। সমাধির বিশেষ ধরন ও ঢাকনায় থাকা ক্রুশচিহ্ন তাঁর এই ধারণাকে সমর্থন করে বলে দাবি করেছেন তিনি।

গবেষকের বিশ্লেষণে সম্ভাব্য পরিচয় হিসেবে দুজন ধর্মযাজকের নাম এসেছে—অ্যালফউইগ ও উলফনথ। অ্যালফউইগ ১০২০ সালের দিকে মারা যান বলে ধারণা করা হয়, আর উলফনথের মৃত্যু হয় ১০৪৯ সালে। তাঁদের মধ্যে অ্যালফউইগকেই তুলনামূলকভাবে সম্ভাব্য ব্যক্তি মনে করছেন রডওয়েল। কারণ, তিনি আগের অ্যাবটের মৃত্যুর সময় থেকেই ওয়েস্টমিনস্টারের ধর্মীয় দায়িত্বে ছিলেন এবং প্রায় ২৭ বছর ওই দায়িত্ব পালন করেন।

রডওয়েলের ধারণা, পুনর্ব্যবহার করা পাথরের কফিনটি প্রথমে অ্যাবি চার্চের পূর্বাংশে স্থাপন করা হয়েছিল। এর ঢাকনা কোনো এক সময়ে মেঝের পাথর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। পরে রাজা তৃতীয় হেনরির শাসনামলে নির্মাণকাজের সময় কফিনটি সরিয়ে অন্য জায়গায় মাটিচাপা দেওয়া হয়।

গবেষকের মতে, এই আবিষ্কার ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির অতীত ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কঙ্কালটির পরিচয় সম্পর্কে তাঁর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিলেও, অ্যালফউইগ বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির দেহাবশেষ হিসেবে চূড়ান্ত শনাক্তকরণের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts