আন্তর্জাতিক ডেক্স:

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে জল্পনা বাড়ছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার কথা। তবে প্রার্থী বাছাইয়ে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ।

জাতিসংঘের ৮১ বছরের ইতিহাসে এবার প্রথমবারের মতো কোনো নারী মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রচলিত অনানুষ্ঠানিক আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে। তবে এসব প্রত্যাশার পাশাপাশি বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আটজন আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব পদে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান, গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি, ইকুয়েডরের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইভন আ-বাকি, মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা গারসেস, উগান্ডার ওলার ওতুনু, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের লানা নুসেইবেহ।

নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ অনানুষ্ঠানিক ভোটে তুলনামূলকভাবে বেশি সমর্থন পেয়েছেন রেবেকা গ্রিনস্প্যান, ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট ও রাফায়েল গ্রোসি। তবে কোনো প্রার্থীরই চূড়ান্ত নিয়োগ নিশ্চিত হয়নি। গ্রিনস্প্যানের পক্ষে নয়টি ভোট পড়লেও পাঁচটি আপত্তি এসেছে, যার মধ্যে দুটি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যের। ফলে সমর্থনের সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও তাঁর সামনে বাধা রয়েছে।

নির্বাচনে স্থায়ী পাঁচ সদস্যের প্রভাব

জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ মহাসচিব নিয়োগ দেয়। সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র থাকলেও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত নয়জনের সমর্থন পেতে হয় একজন প্রার্থীকে। একই সঙ্গে স্থায়ী পাঁচ সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্সের কোনো একটি দেশ ভেটো দিলে সেই প্রার্থীকে মহাসচিব পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা যায় না। এ কারণে অন্য সদস্যদের ব্যাপক সমর্থন থাকলেও কোনো প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলো নতুন প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে। তবে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অঞ্চল বা লিঙ্গের চেয়ে যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে তিনি মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে, আঞ্চলিক পালাবদলের অনানুষ্ঠানিক রীতি অনুসারে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এবার নিজেদের অঞ্চল থেকে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার প্রত্যাশা করছে। তবে এ বিষয়ে বাধ্যতামূলক কোনো নিয়ম নেই। ফলে আঞ্চলিক প্রত্যাশা পূরণেও বড় শক্তিগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নতুন মহাসচিবের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

নতুন মহাসচিবকে দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিক আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিরসনে দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা আরও কার্যকর করতে হবে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সংস্থাটির বাজেটের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় পদ ছাঁটাই এবং বিভিন্ন সংস্থার কাজের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার মতো বিষয়গুলোও নতুন নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতবিরোধের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে যাচ্ছে। এতে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নতুন মহাসচিবকে এসব সংকট মোকাবিলা করে সংস্থাটির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে।

এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা বাড়ানোও তাঁর দায়িত্বের অংশ হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে?

অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ কোনো প্রার্থীকে নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত বর্তমান আট প্রার্থীর মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেওয়া হবে, নাকি নতুন কোনো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্ত হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের নির্ধারিত সময় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি। এর আগে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচন শুধু জাতিসংঘের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণের বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট ও বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সংস্থাটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts