নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, যানজট কমানো এবং যাত্রীসেবার মান বাড়াতে বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুটকে সমন্বয় করে ৩২টি রুটে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ছয়টি রুটে রোববার (১ নভেম্বর) নতুন ব্যবস্থায় বাস চলাচল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি নির্ধারিত রুটে একটি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার ব্যবস্থা করা হবে। এতে যাত্রী ওঠানোর জন্য বাসগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমবে এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান জানান, দীর্ঘদিনের পরিবহন বিশৃঙ্খলা দূর করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের চলাচলের চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং যানবাহনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে ৩২টি সমন্বিত রুটের পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য রাজধানীতে নিরাপদ, পরিকল্পিত ও যাত্রীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ডিটিসিএ সূত্র জানায়, ঢাকার বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয়েছিল ২০১১ সালে। তখন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ডের (ডিটিসিবি) মাধ্যমে পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০১৯ সাল থেকে আগের বিভিন্ন সমীক্ষা পর্যালোচনা করে নতুন পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে ডিটিসিএ। প্রথমে ৪২টি রুটের প্রস্তাব করা হলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থা, বাসমালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে ৩২টি রুট নির্ধারণ করা হয়।
এ পরিকল্পনা তৈরিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট মডেল ব্যবহার করে যাত্রী চলাচলের প্রবণতা, রুটের প্রয়োজনীয়তা ও পরিবহন নেটওয়ার্কের কার্যকারিতাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ডিটিসিএর হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৩২টি রুটে প্রতিদিন প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ লাখ যাত্রীর চলাচলের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এটি মোট পারসন ট্রিপের প্রায় ৮ শতাংশ। নতুন রুটগুলোর গড়ে ৭০ শতাংশ বিদ্যমান বাস চলাচলের পথের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বর্তমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত রুটগুলোতে বিমানবন্দর, মিরপুর-১০, কুড়িল, গাবতলী, মহাখালী, ফার্মগেট, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হতে যাওয়া ছয়টি রুট হলো—
১. গাজীপুরের শিববাড়ী চৌরাস্তা থেকে আব্দুল্লাহপুর হয়ে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির।
২. মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে সায়েন্স ল্যাব হয়ে চুনকুটিয়া।
৩. মোহাম্মদপুরের বসিলা-ঘাটারচর থেকে শাহবাগ ও মৎস্য ভবন হয়ে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার।
৪. বসিলা থেকে সায়েন্স ল্যাব ও জিগাতলা হয়ে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড-কাঁচপুর সেতু।
৫. মোহাম্মদপুরের ঘাটারচর থেকে মিরপুর-১০ হয়ে আব্দুল্লাহপুরের ধউর সেতু।
৬. টঙ্গী কলেজ গেট থেকে আব্দুল্লাহপুর হয়ে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির।
পরিবহন মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষামূলকভাবে এসব রুটে বাস পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানিকে সমন্বিত করা হচ্ছে। প্রজাপতি, পরিস্থান ও বিকাশ পরিবহন মিলে ‘পিপিবি সিটি পরিবহন’ নামে একটি কোম্পানি গঠনের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর, মহাখালী, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও কলাবাগান হয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রুটে বিকাশ পরিবহন, বিকাশ সেবা ট্রান্সপোর্ট ও ভিআইপি পরিবহন যৌথভাবে বাস চালাবে।
গাবতলী-শ্যামলী-আগারগাঁও-মহাখালী-রামপুরা-ডেমরা রুটে আলিফ এন্টারপ্রাইজ, বৈশাখ পরিবহন ও রইচ পরিবহন সমন্বিতভাবে বাস পরিচালনা করবে। দুয়ারীপাড়া-টেকনিক্যাল-আসাদগেট-নিউমার্কেট-সদরঘাট রুটে ট্রান্স সিলভা, দিশারী পরিবহন ও মেট্রো লিংক কাজ করবে।
অন্যদিকে, ঘাটারচর থেকে সায়েন্স ল্যাব, মৎস্য ভবন, মালিবাগ ও রামপুরা হয়ে ডেমরা এবং ঘাটারচর থেকে মোহাম্মদপুর, সায়েন্স ল্যাব, কাকরাইল, হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত রুটে কয়েকটি পরিবহন প্রতিষ্ঠান মালিক সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাস চালাবে।
এ ছাড়া স্বাধীন, বিহঙ্গ, বিকল্প ও শিকড় পরিবহন মিরপুর-১২ থেকে ফার্মগেট, গুলিস্তান হয়ে মাওয়া পর্যন্ত রুটে বাস পরিচালনার পরিকল্পনায় রয়েছে।
পর্যায়ক্রমে বাকি সমন্বিত রুটগুলোও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থাটি কার্যকর হলে রাজধানীর বাস চলাচলে বিশৃঙ্খলা কমার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি কিছুটা লাঘব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।