নিউজ প্রবাসী ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে তীব্র পানিসংকট মোকাবেলায় কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ড্রোনের সাহায্যে মেঘে রাসায়নিক উপাদান ছড়িয়ে বৃষ্টি নামানোর এ পদ্ধতি ব্যবহার করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তবে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার হোমার শহরে গত ২৩ আগস্ট কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানোর একটি পরীক্ষা চালায় সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ রেইনমেকার্স। কোম্পানিটির দাবি, মাত্র তিন ঘণ্টায় তাদের পরীক্ষার মাধ্যমে আকাশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ গ্যালন পানি তৈরি হয়েছে।
এ পরীক্ষার বিষয়ে আগে থেকে জানতেন না স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে। বিষয়টি জানার পর পরিবেশগত নিরাপত্তা ও ব্যবহৃত রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্লাউড-সিডিং নামে পরিচিত এ প্রযুক্তি ৮০ বছরেরও বেশি পুরোনো। এতে সাধারণত উড়োজাহাজ বা ড্রোনের সাহায্যে মেঘের মধ্যে সিলভার আয়োডাইডের মতো উপাদান ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে বরফের ক্ষুদ্র স্ফটিক তৈরি হতে পারে, যা উপযুক্ত আবহাওয়ায় বৃষ্টি বা তুষারপাত ঘটাতে সহায়তা করে।
তবে এ পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট আবহাওয়াগত পরিস্থিতি প্রয়োজন। মেঘ না থাকলে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব নয়। ফলে পানির সংকটের সার্বিক সমাধান হিসেবে এ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
‘সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি’র আলাস্কা অঞ্চলের পরিচালক কুপার ফ্রিম্যান পরীক্ষার বিষয়ে স্থানীয়দের আগে অবহিত না করা এবং ব্যবহৃত রাসায়নিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব যাচাইয়ে যথাযথ গবেষণার প্রমাণ থাকা জরুরি। তিনি আরও মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ পানিসংরক্ষণের মতো মৌলিক বিষয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে, রেইনমেকার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অগাস্টাস ডরিকো বলেছেন, তাদের প্রতিটি উড্ডয়নে প্রায় ২০ গ্রাম সিলভারভিত্তিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। তাঁর দাবি, বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় মাটিতে এর ঘনত্ব অত্যন্ত কম থাকে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের নির্ধারিত সীমার নিচে।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো, ইউটাহ ও কলোরাডোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এবং জর্ডানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ডরিকোর ভাষ্য, জর্ডানের মতো পানিসংকটে থাকা দেশে মানুষের পানি সরবরাহের চাহিদা মেটাতে এ প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।
ক্লাউড-সিডিংয়ের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৪৬ সালে। সে সময় জেনারেল ইলেকট্রিকের গবেষকেরা প্রথমে শুকনো বরফ ব্যবহার করে মেঘে বৃষ্টিপাত ঘটানোর পরীক্ষা চালান। পরের বছর সিলভার আয়োডাইডকে আরও কার্যকর সিডিং উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুকূল আবহাওয়ায় এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বৃষ্টিপাত ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে এর ফলাফল সব সময় একরকম হয় না। রেইনমেকার্সের দাবিকৃত ১ কোটি ৯০ লাখ গ্যালন পানিও প্রায় ২৫৯ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে দিলে মাত্র ০.০১ ইঞ্চি বৃষ্টির সমপরিমাণ হয়।
এদিকে, বিকল্প উপাদান ব্যবহারের চেষ্টা করছে প্রযুক্তি খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও। সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক রিসাস্ট সিস্টেমসের প্রধান নির্বাহী অলিভিয়া লি জানিয়েছেন, তাঁরা মাটি থেকে সংগৃহীত অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি প্রোটিন নিয়ে পরীক্ষা করছেন। টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটিতে এ বিষয়ে গবেষণা চলছে। তাঁর দাবি, নতুন উপাদানটি সিলভার আয়োডাইডের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ আবহাওয়া পরিবর্তনসংক্রান্ত কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে। পানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত প্রযুক্তির প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং পানিসংকট মোকাবেলায় প্রকৃত অবদান কতটা—সেসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো প্রয়োজন।