অর্থনীতি ডেস্ক
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাপড় ও বিভিন্ন কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ায় আমদানিনির্ভরতা কমছে। এর ফলে রপ্তানি আয়ের বড় অংশ দেশের অর্থনীতিতে থেকে যাওয়ায় খাতটিতে মূল্য সংযোজনও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৯ কোটি ৮২ লাখ ডলার। এর মধ্যে কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩৮৬ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৩৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের হার দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
এক বছর আগে একই সময়ে মূল্য সংযোজনের হার ছিল ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ৯১১ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৩৯৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এখন আগের তুলনায় উন্নতমানের কাপড়, জিপারসহ পোশাক তৈরির বিভিন্ন উপকরণ উৎপাদন হচ্ছে। বিশেষায়িত কিছু কাঁচামাল ছাড়া অধিকাংশ প্রয়োজনীয় উপকরণ স্থানীয় বাজার থেকেই সংগ্রহ করতে পারছেন উদ্যোক্তারা। এতে একদিকে আমদানি ব্যয় কমছে, অন্যদিকে দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহ সম্ভব হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহও বাড়ছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক বলেন, দেশে পোশাকশিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদন বাড়ায় মূল্য সংযোজনের হার বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে কাপড় সংগ্রহ করতে পারায় উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত সময়ও কম লাগছে।
তার মতে, নতুন নতুন কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ছে। বিশেষ ধরনের কাপড় ছাড়া অধিকাংশ কাপড় এখন স্থানীয় টেক্সটাইল মিল থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেও পোশাক খাতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন ছিল ৬১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে এ হার ছিল ৬৪ দশমিক ২২ শতাংশ, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মূল্য সংযোজনের হার পোশাকের ধরন, নকশা, মান ও ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়। সাধারণ টি-শার্ট বা ট্রাউজারের তুলনায় মাঝারি ও উচ্চমূল্যের পোশাকে মূল্য সংযোজনের হার বেশি থাকে।
ডেনিম খাতের উদ্যোক্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা ও সুতার দাম কমার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে কাঁচামাল সহজলভ্য হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কমেছে। এছাড়া ওভেন পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধিও মূল্য সংযোজন বাড়ার একটি কারণ।
সরকারও স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহিত করতে তৈরি পোশাক খাতে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার নির্ধারণ করে দিয়েছে। সর্বশেষ আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ অনুযায়ী, পোশাকের ধরন ও কাঁচামাল আমদানির সুবিধাভেদে এ হার ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, সিনথেটিক ফাইবার ও বিশেষায়িত পোশাক তৈরিতে নির্ধারিত উচ্চ মূল্য সংযোজনের হার বাস্তবায়ন এখনো কঠিন। তাদের মতে, এ ধরনের পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থানীয়ভাবে কাপড় ও আনুষঙ্গিক কাঁচামাল উৎপাদনের পরিধি আরও বাড়ানো গেলে তৈরি পোশাক খাতের আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং রপ্তানি আয়ের বড় অংশ দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।