নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রশ্নটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার ইঙ্গিত দেওয়ার পর বিষয়টি ঘিরে আওয়ামী লীগ, সরকার এবং ভারতের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ততই জটিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণে আটকে পড়ছে।
আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে কিংবা তার আগেই দেশে ফিরতে পারেন। অন্যদিকে সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্বেচ্ছায় ফেরার চেয়ে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে তাকে দেশে আনার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টিও এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে ফিরলে তাকে সাজা ভোগ করতে হবে। একই সঙ্গে তার আপিলের সুযোগ নিয়েও সরকারি মহল থেকে কঠোর বক্তব্য এসেছে।
অন্যদিকে শেখ হাসিনা নিজেও দেশে ফেরার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেও তাকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে। কারাবন্দি বা নির্যাতনের আশঙ্কার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ঝুঁকি নেওয়ার কথাও বলেছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
হাসিনার দেশে ফেরার আলোচনা নতুন করে গতি পায় গত জুলাইয়ে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান। পরবর্তী সময়ে দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনেও দেশে ফেরার বিষয়ে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান তিনি।
এ নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থান করে তার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যে সরকারের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। সরকারি মুখপাত্র জাহেদ উর রহমান বলেছেন, হাসিনাকে স্বেচ্ছায় আসার অপেক্ষায় না থেকে ধরে দেশে আনার বিষয়টি সরকার চায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে ফিরলে হাসিনার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে।
এই অবস্থান থেকেই প্রশ্ন উঠছে—হাসিনা নিজে দেশে ফিরতে চাইলে তাকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে আনার ওপর এতটা জোর কেন? বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রত্যর্পণের দাবি অব্যাহত থাকলে বাস্তবে তার দেশে ফেরার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হতে পারে। কারণ ভারত তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
হাসিনা ইস্যুটি শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আগামী দিনের ক্ষমতার সমীকরণও জড়িয়ে আছে।
আওয়ামী লীগের ওপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে দলটির পুনর্গঠনের সুযোগ কতটা থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির অবস্থানও এই সমীকরণকে প্রভাবিত করছে।
ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এখন আর শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং দেশের রাজনীতির পরবর্তী গতিপথ। ডিসেম্বর যত ঘনিয়ে আসবে, হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে এই প্রশ্নগুলোই আরও সামনে আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts