নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর প্রকাশ্যে এসেছে তৎকালীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডকে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতার ফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও নিরাপত্তা সদস্য থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীরা কার্যকর কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়েনি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সামরিক অভ্যুত্থানের সময় নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ঘটনার পর ৬ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিশন ওই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে দীর্ঘ ৪৫ বছর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের রাতে সার্কিট হাউসে ২৬ জন কনস্টেবল, ছয়জন হাবিলদার, একজন সুবেদার এবং প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যরা দায়িত্বে ছিলেন। তাদের কাছে রাইফেল, সাবমেশিনগান ও লাইট মেশিনগানের মতো অস্ত্রও ছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে নিরাপত্তাকর্মীদের অনেকে আশ্রয়ে চলে যান। সার্কিট হাউসের প্রধান ফটকও খোলা ছিল। ফলে হামলাকারীরা প্রায় বাধাহীনভাবে ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে বা দোতলায় কোনো নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ছিল না। অথচ সেখানে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী অবস্থান নিলেই হামলা প্রতিহত করা সম্ভব ছিল।
প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত স্টাফদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের আগে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিবর্তন এবং নিরাপত্তাকর্মী সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকেও কমিশন তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ মে রাত ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে হামলাকারীরা সার্কিট হাউসে আক্রমণ চালায়। রকেট লঞ্চার ও গ্রেনেড হামলার পর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বের হয়ে ‘তোমরা কী চাও’ বলে জানতে চাইলে হামলাকারীরা গুলি চালায়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তার শরীরে ২০টি গুলির চিহ্ন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ কীভাবে সার্কিট হাউস থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, সে বিষয়েও তদন্ত করেছে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সকালে সামরিক সদস্যরা সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে জিয়াউর রহমানের মরদেহসহ আরও দুজন কর্মকর্তার মরদেহ নিয়ে যায়। পরে রাঙ্গুনিয়ার পাথরঘাটা এলাকায় একটি গণকবর থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত কমিশনের মতে, হত্যাকাণ্ডের আগে চট্টগ্রামে সামরিক অসন্তোষ ও বিদ্রোহের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য ছিল। তবে সেই তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তৎকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রের বিষয়েও আগাম তথ্য থাকার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে বিদ্রোহী প্রশাসন গড়ে তোলার মূল ভূমিকা ছিল মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের। তবে ওই বিদ্রোহী তৎপরতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরে মঞ্জুর আত্মসমর্পণ করলে তাকে সেনাবাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে তিনি নিহত হন।
প্রতিবেদনের চূড়ান্ত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পেছনে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন মাত্রার ব্যর্থতা ছিল। পর্যাপ্ত অস্ত্র ও প্রশিক্ষিত সদস্য থাকার পরও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে না ওঠায় হামলাকারীরা রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে নির্বিঘ্নে সরে যেতে সক্ষম হয়।
দীর্ঘ ৪৫ বছর গোপন থাকার পর প্রকাশ্যে আসা এই তদন্ত প্রতিবেদন ১৯৮১ সালের ওই হত্যাকাণ্ডের নিরাপত্তা ব্যর্থতা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts