আন্তর্জাতিক ডেস্ক: 

ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলনে দ্রুত পরিচিতি পাওয়া মুখ নেহা বোরা। কখনো পুলিশের ব্যারিকেডে উঠে স্লোগান, কখনো আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে অবস্থান, আবার কখনো টানা অনশনে—বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছে ২৯ বছর বয়সী এই তরুণীকে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) পিএইচডি গবেষক নেহা একই সঙ্গে বামপন্থি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি। সংগঠনটি নকশালপন্থী সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র শাখা হিসেবে পরিচিত।

তবে শুধু ছাত্র রাজনীতির পরিচয়ে নেহাকে চেনা যাচ্ছে না। শিক্ষা ও নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনসহ ভারতের বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইস্যুতে রাজপথে সরব হয়েছেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই তার বক্তৃতা ও আন্দোলনের নানা দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

অনশন থেকে জাতীয় পরিচিতি

২০২৬ সালের মাঝামাঝি দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া ছাত্র-যুব আন্দোলন নেহাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এ প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ওই আন্দোলনে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন অংশ নেয়।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অন্য আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অনশনে বসেন নেহা। টানা ২৩ দিন খোলা আকাশের নিচে অনশন করার একপর্যায়ে তার রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। চিকিৎসকেরা হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান।

তার এই অবস্থান জাতীয় গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্যের ভিডিওও ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে।

নেহা অবশ্য ওই আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের বলে মনে করেননি। তার মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে তৈরি হয়েছে।

রাহুল গান্ধীর পাশে নেহা

আন্দোলনের সময় নেহার রাজনৈতিক পরিচিতি আরও বাড়ে। ২৫ জুলাই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর পাশে দেখা যায় তাকে।

রাহুলের সঙ্গে বৈঠকের পর নেহা সাংবাদিকদের জানান, শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে আন্দোলনকারীরা সরে আসবেন না। রাহুল গান্ধীও তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান।

এরপর ছাত্রনেতার পরিচয়ের বাইরে জাতীয় পর্যায়ের তরুণ আন্দোলনকর্মী হিসেবে নেহার পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়।

রাঁচিতে হামলা, তবু থামেননি

শুধু দিল্লিতে নয়, বিভিন্ন রাজ্যের আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন নেহা। ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির পরীক্ষা ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে রাঁচিতে যান তিনি।

সেখানে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তার শরীরে কালি ছুড়ে মারা হয়। তবে এতে দমে না গিয়ে কালিমাখা অবস্থাতেই তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান।

পরে বিহারেও আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন এই তরুণী।

ভোটার তালিকা নিয়েও আন্দোলনে

সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরুতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন নেহা। ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ প্রতিবাদ শুরু করে।

২ অক্টোবর নেহা বোরা ও যোগেন্দ্র যাদবসহ কয়েকশ আন্দোলনকারীকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। ৪ অক্টোবর যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় ব্যারিকেড অতিক্রমের চেষ্টা করলে নেহাকে আবারও আটক করা হয়। পরে তাকে দিল্লি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের নারেলা এলাকায় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তাতেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি তিনি। ৬ অক্টোবর কলকাতার এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও অংশ নেন নেহা।

থিয়েটারই রাজনীতির পথে প্রথম ধাপ

নেহার রাজনৈতিক সক্রিয়তার শুরু সরাসরি ছাত্র রাজনীতি দিয়ে নয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ‘সাংওয়ারি’ নামে একটি থিয়েটার দলের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পথনাটকসহ বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে সমাজের নানা স্তরের মানুষের সমস্যা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার পরিচয় তৈরি হয়।

পরে জেএনইউতে গিয়ে তিনি এআইএসএর সঙ্গে যুক্ত হন। শিক্ষা খাতে বেসরকারিকরণ, ফি বৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও নারীদের নিরাপত্তার মতো বিষয় নিয়ে ক্যাম্পাসের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে একপর্যায়ে এআইএসএর জাতীয় সভাপতির দায়িত্ব পান।

বিজেপি সমর্থক পরিবার, বাম রাজনীতিতে নেহা

উত্তরাখণ্ডের খাটিমায় জন্ম নেওয়া নেহার বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বাবার চাকরির কারণে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় তার শৈশব কেটেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির দিল্লি পাবলিক স্কুলেও পড়াশোনা করেছেন তিনি।

পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ড. বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। বর্তমানে জেএনইউর স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাসথেটিকসে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিষয়ে পিএইচডি করছেন।

নেহার রাজনৈতিক অবস্থান তার পারিবারিক পরিচয়ের কারণেও আলোচিত। তার পরিবার দীর্ঘদিন বিজেপির সমর্থক হলেও তিনি বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে তার আদর্শিক মতপার্থক্যও তৈরি হয়েছে।

গডসে নয়, ভগৎ সিংয়ের আদর্শ

নেহা নিজেকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখেন। আরএসএস ও বিজেপির রাজনীতিরও তিনি প্রকাশ্য সমালোচক।

তার বক্তব্য, তরুণদের শিক্ষা, চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সংকট তৈরি হলেও অনেক সময় ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এক আন্দোলনে ব্যবহৃত একটি পোস্টারের বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, একদিকে গডসে আর অন্যদিকে ভগৎ সিং—এই আদর্শিক পার্থক্যই তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য তুলে ধরে।

তার আন্দোলন পরিবারের ওপরও প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন নেহা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিপেটা ও দমন-পীড়নের দৃশ্য দেখার পর তার মা আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন।

‘তুলনা নয়, সংহতি’

প্রতিবাদী অবস্থান ও জ্বালাময়ী বক্তব্যের কারণে নেহা বোরার জনপ্রিয়তা বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে আলোচনা যেমন হচ্ছে, তেমনি অন্য তরুণ নেতাদের সঙ্গে তার তুলনাও টানা হচ্ছে।

তবে এমন তুলনায় আপত্তি জানিয়ে নেহা বলেছেন, ‘তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি।’

থিয়েটারের কর্মী হিসেবে যাত্রা শুরু করে ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্বে আসা নেহা এখন ভারতের বিভিন্ন আন্দোলনের পরিচিত মুখ। শিক্ষা, চাকরি কিংবা ভোটাধিকার—বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে তার সক্রিয় উপস্থিতি তাকে দেশটির ছাত্র-যুব আন্দোলনের আলোচিত কণ্ঠে পরিণত করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts