নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় বাড়ছে মানবিক সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পূর্ণ হলেও কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত স্পষ্ট ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। সামরিক হামলা, পাল্টা প্রতিক্রিয়া, অর্থনৈতিক অবরোধ ও কূটনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে সংঘাতটি এখন দীর্ঘস্থায়ী এক অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পশ্চিম এশিয়ার বাইরে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায়ও।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানে সামরিক হামলা শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুতে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করা, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের চাপ সৃষ্টি করা। তবে সময়ের সঙ্গে সেই লক্ষ্য অনেকটাই বদলে গিয়ে এখন হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা ও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিকেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার মতো বড় ঘটনা ঘটলেও দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোয় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। বরং তেহরানের সরকার ক্ষমতায় টিকে রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতিও অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বেশি হলেও সেটিকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ইরানও সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়লেও এখনো আত্মসমর্পণের কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
হরমুজ সংকটে বিশ্ববাজারে চাপ
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেল, গ্যাস ও বিভিন্ন পণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
এর ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ও আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিও নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
অর্থনৈতিক চাপে ইরান, তবু টিকে আছে সরকার
যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তবে অতীতের মতো এবারও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, জনগণের অসন্তোষ বাড়লেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকার পতনের দিকে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতায় ইরান বিভিন্ন ধরনের চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় নিরাপত্তা সমীকরণ
এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকেও নিজেদের নিরাপত্তা নীতি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিকল্প সামরিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব বাড়ানোর প্রবণতা জোরদার হচ্ছে।
ফলে পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চীন-ভারতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় পক্ষের ওপরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে। তবে চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো ইরানের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা সীমিত করবে, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তেহরানের সঙ্গে এসব দেশের সম্পর্ক অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানকে চাপে রাখতে গিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট আরও বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
ইউক্রেইন যুদ্ধেও পড়ছে প্রভাব
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে ইউক্রেইন যুদ্ধের ওপরও। পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাত মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিপুল অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর ফলে ইউক্রেইনের জন্য নির্ধারিত সামরিক সহায়তার একটি অংশ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার জ্বালানি আয় বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি হয়েছে। এতে ইউক্রেইন যুদ্ধের অর্থনৈতিক সমীকরণ নতুন মোড় নিতে পারে।
শেষ কোথায়?
ছয় মাসের যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—কোনো পক্ষই এখনো এমন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি, যেখান থেকে নিজেদের নিঃসন্দেহে বিজয়ী ঘোষণা করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র চায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কমাতে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ইরান চায় অবরোধ ও সামরিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে, তবে আত্মসমর্পণের চিত্র তৈরি না করে।
ফলে সমঝোতার পথ সংকীর্ণ হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ প্রতিদিনই বাড়ছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের পাশাপাশি এর মূল্য দিতে হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিকেও।
এই সংঘাতের ছয় মাস শেষে তাই প্রশ্ন শুধু কে জিতল বা হারল, তা নয়। বরং বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই ব্যয়বহুল অচলাবস্থা কত দিন চলবে এবং শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ আগে এমন একটি সমঝোতায় রাজি হবে, যাকে নিজেদের পরাজয় বলে মনে হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts