নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
দেশে সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকার পরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ায় সংকটে পড়েছেন। কোথাও সরকারি দামে সার মিলছে না, আবার কোথাও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য, দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা, অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান সংকট দ্রুত নিরসন করা না গেলে সামনে বোরো মৌসুমে আরও বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে আমন মৌসুমে সারের চাহিদা বেড়েছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকরা সময়মতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। সরকারি দামে সার না পেয়ে অনেক কৃষককে খোলা বাজার থেকে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে টিএসপি ও ডিএপি সার বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের অভিযানে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, অবৈধ মজুদ এবং লাইসেন্স ছাড়া সার ব্যবসার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
শুধু গত আগস্ট মাসেই দিনাজপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর, জামালপুর, মাগুরা ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযানে বিপুল পরিমাণ সার জব্দ করা হয়েছে। যশোরের চৌগাছায় ১৩ হাজার ৫৫০ কেজি সার অবৈধভাবে মজুদের অভিযোগে জব্দ করা হয়।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সব এলাকায় একই সময়ে ও একই পরিমাণে সারের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় চাহিদা ও মৌসুমভিত্তিক পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোনো এলাকায় চাহিদার তুলনায় সার কম পড়ছে, আবার অন্য এলাকায় মজুদ থাকলেও তা প্রয়োজনীয় এলাকায় দ্রুত সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
রাজশাহী জেলায় সেপ্টেম্বর মাসে কৃষকের সংখ্যার তুলনায় টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের বরাদ্দ অপ্রতুল বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এ ছাড়া কৃষিজমির পাশাপাশি মাছের পুকুরসহ অন্যান্য খাতে সারের চাহিদা থাকায় বরাদ্দের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস শেষে দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৮৬ হাজার ১০০ টন সার মজুদ রয়েছে। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮৬ হাজার টন বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে গুদামে সার মজুদ থাকা আর কৃষকের হাতে সময়মতো সঠিক দামে সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. গোলাম রসুল মনে করেন, বর্তমান সংকট মূলত সারের অপ্রতুলতার কারণে নয়; বরং বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও কার্যকর তদারকির অভাব এর অন্যতম কারণ। তার মতে, কোথায় কত সার যাচ্ছে, ডিলার পর্যায়ে কী পরিমাণ সার এসেছে এবং কৃষকের কাছে কতটুকু বিক্রি হচ্ছে—এসব তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সামনে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বোরো মৌসুম শুরু হবে। দেশের খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশ আসে বোরো ধান থেকে এবং এ মৌসুমেই মোট ব্যবহৃত সারের বড় অংশ প্রয়োজন হয়। বর্তমান আমন মৌসুমের সংকট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে বোরো মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ডিলারদের মজুদ ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ্যে প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব এলাকায় অতিরিক্ত সার রয়েছে, সেখান থেকে দ্রুত ঘাটতিপূর্ণ এলাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে কালোবাজারি, অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts