নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
ঢাকার সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে বগুড়ার প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনায় র্যাবের গ্রেপ্তার করা সন্দেহভাজনদের সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মোটরসাইকেলের রঙ ও মডেলে অমিলের পাশাপাশি ঘটনার সময় অভিযুক্তদের অবস্থান এবং গ্রেপ্তারের স্থান নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা অসঙ্গতি।
গত ২৯ আগস্ট ভোরে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিন ছিনতাইয়ের শিকার হন। স্বামীর সঙ্গে রিকশায় হাসপাতালে যাওয়ার সময় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি তার ব্যাগে টান দেয় বলে অভিযোগ। এতে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর র্যাব-২ তিনজনকে গ্রেপ্তার এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানায়। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে র্যাবের দেওয়া তথ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মামলার এফআইআর অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে। কিন্তু ওই সময় গ্রেপ্তার হওয়া বাইক মালিক রাকিবের মোটরসাইকেলটি তার বাসার গ্যারেজে রাখা ছিল বলে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে রাত ২টা ৬ মিনিটে রাকিবকে ওই মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরতেও দেখা যায়।
রাকিবের স্ত্রীও দাবি করেছেন, কয়েক দিন ধরে তার স্বামীর মোটরসাইকেল অন্য কারও কাছে ছিল বলে র্যাব যে তথ্য দিয়েছে, তা সঠিক নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় বাইকটি বাসাতেই ছিল।
অন্যদিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার পনি ও সেড্রিকের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি বাসার ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে ঘটনার সময়ের কাছাকাছি তাদের সেখানে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ভিডিও অনুযায়ী, ভোর ৫টা ৪১ মিনিটের দিকে তারা বাসায় ফিরে খাবার নিয়ে প্রবেশ করেন এবং পরে অন্য একজনের সঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন।
গ্রেপ্তারের স্থান নিয়েও এফআইআরের তথ্যের সঙ্গে স্থানীয়দের বক্তব্যে অমিল পাওয়া গেছে। নথিতে পনি ও সেড্রিককে একই স্থান থেকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও স্থানীয় এক নিরাপত্তাকর্মীর দাবি, পনিকে একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে রাতে নিয়ে যায় র্যাব। অন্যদিকে সেড্রিককে অন্য একটি এলাকা থেকে আটক করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে একটি নীল বা গাঢ় রঙের মোটরসাইকেল দেখা গেলেও র্যাবের উদ্ধার করা বাইকটি রূপালি ও কালো রঙের। মোটরসাইকেল বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা বাইকটি সুজুকি জিক্সার এসএফ সিরিজের হতে পারে, আর উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি ইয়ামাহা আর১৫—দুটি ভিন্ন মডেলের বাহন।
তবে র্যাব বলছে, গ্রেপ্তার তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। র্যাবের দাবি, ঘটনার সময় ও আশপাশের সময়ে সন্দেহভাজনদের মোবাইলের অবস্থান ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পাওয়া গেছে। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের কাছ থেকে অসংলগ্ন তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদেরই চূড়ান্ত অপরাধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আইন ও অপরাধবিজ্ঞান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্তে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। নির্দোষ কেউ ভুলভাবে মামলায় জড়িয়ে পড়লে একদিকে যেমন বিচারের ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তারদের সম্পৃক্ততা, মোটরসাইকেলের পরিচয় এবং ঘটনার সময় তাদের প্রকৃত অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে এখন তদন্তের দিকেই তাকিয়ে আছে নিহত শিক্ষিকার পরিবার ও সাধারণ মানুষ।