নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
দ্রুত নগরায়ণের চাপে গত এক দশকে ঢাকার সবুজ আচ্ছাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে কমেছে জলাশয় ও পতিত জমি, বিপরীতে বেড়েছে নির্মাণ এলাকা। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ঢাকা শহরের গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা ৩১ শতাংশ কমেছে।
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) ‘ঢাকা শহরের ভূমি ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদনের পরিবর্তন বিশ্লেষণ: ২০১৫–২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৫ সালে ঢাকা শহরে গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা ছিল ৩ হাজার ৭৮৪ দশমিক ১৯ হেক্টর। মোট আয়তনের হিসাবে এর পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০৮ দশমিক ৯৯ হেক্টরে, যা মোট এলাকার ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
গবেষণা অনুযায়ী, একই সময়ে ঢাকার জলাশয় কমেছে ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে নির্মাণ এলাকা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারের মতে, নির্মাণ এলাকার বিস্তারের বিপরীতে গাছপালা, জলাশয় ও পতিত জমি কমে যাওয়ায় নগরে জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের গবেষণাতেও ঢাকার সবুজ আচ্ছাদন কমার চিত্র উঠে এসেছিল। ওই গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে ঢাকা মহানগরে গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা ছিল ৫ হাজার ৮০০ দশমিক ৬৪ হেক্টর। ২০০১ সালে তা ৭ হাজার ২০০ হেক্টর এবং ২০১১ সালে ৪ হাজার ৯০০ দশমিক ২৭ হেক্টরে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে এই পরিমাণ কমে হয় ৩ হাজার ৮০০ দশমিক ১৬ হেক্টর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সফি উল্লাহ বলেন, একসময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাশয় ও সবুজ জমি থাকলেও সেসব জায়গার অনেকটাই এখন আবাসিক এলাকা ও ভবনে পরিণত হয়েছে। পুরোনো গাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণের জন্য উপযুক্ত জায়গা তৈরি এবং খাল, জলাশয় ও নদীর পাড় রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এম শফিক-উর রহমানও ঢাকার সবুজ ও জলাভূমি কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বড় শহরগুলোতে রাস্তা, সড়ক বিভাজক, নদীর পাড় ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থানে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গাছ টিকে থাকার মতো জায়গা নির্বাচন জরুরি।
এদিকে সবুজায়ন বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি চলমান রয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ২ কোটি ৮২ লাখের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৫৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
রোপণ করা গাছের অবস্থান, প্রজাতি, রোপণের তারিখ, জিও-ট্যাগযুক্ত ছবি ও পরিচর্যার তথ্য সংরক্ষণে ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ তৈরির কাজও চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না; কোন প্রজাতির গাছ কোথায় লাগানো হবে এবং রোপণের পর কীভাবে পরিচর্যা করা হবে, সেটিও পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। তাঁর মতে, পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও নগরের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বৃক্ষরোপণ করতে হবে।
ক্যাপসের চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারও প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতিবছর কত গাছ লাগানো হচ্ছে তার হিসাব থাকলেও কতগুলো গাছ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকছে, সেই তথ্য অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তাঁর মতে, ঢাকার বিদ্যমান সবুজ ও জলাশয় রক্ষার পাশাপাশি নতুন সবুজ স্থান তৈরির উদ্যোগও জরুরি।