নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের মধ্যে শিল্পকারখানায় বাড়ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা পেতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কারখানার ছাদে সৌর প্যানেল বসাচ্ছে।
গাজীপুরের কাশিমপুরে র্যাংকন শিল্প পার্কে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৫০ কিলোওয়াট-পিক সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা দিয়ে এ যাত্রা শুরু হয়। ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়িয়ে বর্তমানে তা প্রায় ৪ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা ৭ মেগাওয়াট-পিকে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
র্যাংকনের হিসাবে, সৌরবিদ্যুৎ চালুর পর শিল্প পার্কটিতে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া প্রায় ৮৭ শতাংশ কমেছে। আগে বছরে প্রায় ৪৭ লাখ ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে নেওয়া হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৬ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ ইউনিটে। বিপরীতে সৌরবিদ্যুৎ থেকে বছরে প্রায় ৪১ লাখ ৬ হাজার ৪০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে।
সৌর প্রকল্পে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পেতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সাত বছর সময় লাগবে বলে জানানো হয়েছে।
শুধু র্যাংকন নয়, আকিজবশির গ্রুপসহ আরও কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীও সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকেছে। ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে আকিজবশিরের একটি কারখানায় ১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা চালুর পর মাসিক বিদ্যুৎ বিলের বড় অংশ কমে এসেছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের বিভিন্ন কারখানা মিলিয়ে বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা প্রায় ৯০ মেগাওয়াট।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, একটি কারখানার ছাদে এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে সাধারণত সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার কোটি টাকা খরচ হয়। এ ব্যবস্থা থেকে মাসে গড়ে এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার কমানো ও বিদ্যুৎ বিল সমন্বয় ধরলে মাসে প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
তবে শিল্পের সব ধরনের জ্বালানি চাহিদা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। মোটর, পাম্প, কম্প্রেসর, সেলাই বা কাটিং মেশিন, ইটিপি, প্যাকেজিং, আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে এটি কার্যকর হলেও বয়লার, স্টিম, ডাইং-ফিনিশিং, ফার্নেস বা ড্রায়ারের মতো উচ্চ তাপনির্ভর কাজে গ্যাস বা অন্য জ্বালানির প্রয়োজন থেকেই যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দিনের বেলায় একটি কারখানার বৈদ্যুতিক চাহিদার প্রায় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত রুফটপ সোলার থেকে মেটানো সম্ভব। পর্যাপ্ত ছাদ থাকলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এর চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, নেট মিটারিংয়ের আওতায় থাকা ৫ হাজার ২৮টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট সক্ষমতা ৩৩৮ দশমিক ০৬৪ মেগাওয়াট-পিক। নেট মিটারিংয়ের বাইরে নথিভুক্ত আরও ৪৩৬টি ব্যবস্থার সক্ষমতা ৯৫ দশমিক ২৮৬ মেগাওয়াট-পিক। সরকারি হিসাবে মোট রুফটপ সোলার সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৪৩৩ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট-পিক।
তবে আইইইএফএর তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবে এ সক্ষমতা আরও বেশি হতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন উৎসের তথ্য মিলিয়ে ২৩৯টি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠীতে ৬৬৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতার তথ্য পাওয়া গেছে। ছোট প্রকল্পগুলো হিসাবের বাইরে থাকায় দেশে মোট সক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারও রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
রুফটপ সোলার ব্যবহারে আর্থিক সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে বড় শিল্পের বাইরে ছোট ও মাঝারি কারখানায় সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বড় বাধা হচ্ছে প্রাথমিক বিনিয়োগ। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, সহজ অনুমোদন এবং বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা না বাড়ালে ছোট ও মাঝারি শিল্পে এ প্রযুক্তির বিস্তার ধীর হতে পারে।
বাংলাদেশের রুফটপ সোলার বাজার এখনো অনেকটাই আমদানিনির্ভর। প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির বড় অংশ চীন থেকে আসছে। তবে স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, মাউন্টিং কাঠামো, কেবল ও প্রকৌশল সেবায় স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববাজারেও সৌর প্রযুক্তিতে চীনা প্রতিষ্ঠানের বড় অংশীদারত্ব রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় পরিসরে উৎপাদন ও প্রতিযোগিতার কারণে সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির দাম কমেছে, যার সুবিধা বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও পাচ্ছে।
তবে নিম্নমানের পণ্য ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পণ্যের উৎপাদনকারী দেশ নয়, বরং মান, সার্টিফিকেশন এবং অনুমোদিত প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পকারখানায় মানসম্মত সৌর সরঞ্জাম ব্যবহারের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি করা গেলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বাজার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।