নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
ঢাকার আশুলিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক রেহানা পারভীনকে হত্যার পর মরদেহ মাটিচাপা দিয়ে তার ওপর সবজির চারা লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ গুমের এমন বিস্তারিত বর্ণনা উঠে এসেছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যার পর রেহানাকে তার স্বামী আওলাদ হোসাইনের বোন পাপিয়া আক্তারের আশুলিয়ার নয়ারহাট চৌরাপাড়ার বাসায় নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন আমজাদ হোসাইন ও কবীর হোসাইন।
পুলিশের অভিযোগ, সেখানে আওলাদ রেহানার সঙ্গে ঝগড়ায় জড়ান। একপর্যায়ে রেহানা ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পাপিয়া তাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেন। এরপর আমজাদ তার দুই পা এবং কবীর দুই হাত চেপে ধরেন। আওলাদ তার পেটের ওপর বসে মুখে বালিশ চেপে ধরেন। এতে রেহানার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ওই রাতেই আওলাদ, আমজাদ, পাপিয়া ও কবীর পাপিয়ার বাড়ির সামনে সেপটিক ট্যাংকের পাশে রেহানার মরদেহ মাটিচাপা দেন বলে অভিযোগ। পরে ওই জায়গায় বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা লাগানো হয়।
রেহানা ২০২৪ সালের ৬ জুন ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসেন। তার স্বামী আওলাদ দেশে আসেন ২৯ জুন। ৩ জুলাই রেহানার সঙ্গে তার মায়ের শেষ কথা হয়। এরপর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
রেহানার মা আইরিন আক্তার প্রথমে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ৮ সেপ্টেম্বর অপহরণের অভিযোগে আওলাদ, তার দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম এবং আত্মীয় আমজাদ হোসাইনকে আসামি করে মামলা করেন। এর আগে আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান।
১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় পাপিয়ার বাড়ির সামনে মাটির নিচ থেকে রেহানার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর অপহরণের মামলাটি হত্যা ও মরদেহ গুমের মামলায় রূপান্তর করা হয়।
তদন্ত শেষে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক তানভীর হাসান খান পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। আসামিরা হলেন—রেহানার স্বামী আওলাদ হোসাইন, তার দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম, চাচাতো ভাই কবীর হোসাইন এবং চাচা আমজাদ হোসাইন।
গত ২১ সেপ্টেম্বর মামলার ধার্য দিনে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমেদ অভিযোগপত্রটি দেখেন। অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য আগামী ১৯ অক্টোবর দিন রেখেছে আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান খান বলেন, রেহানা পারভীনের নামে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় সম্পত্তি ছিল। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি পারিবারিক বিষয় নিয়েও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা চলছিল। অস্ট্রেলিয়ায় একই বাসায় থাকলেও তারা আলাদা থাকতেন। দেশে আসার পর কোনো একটি বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধের পর রেহানাকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এদিকে রেহানা হত্যার তদন্ত প্রভাবিত করতে বাংলাদেশে ঘুষ পাঠানোর অভিযোগে সম্প্রতি আওলাদকে অস্ট্রেলিয়ায় গ্রেপ্তার করেছে দেশটির ফেডারেল পুলিশ। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের অভিযোগ, তিনি দুই বছরে বিভিন্ন কিস্তিতে ৯০ হাজারের বেশি অস্ট্রেলীয় ডলার বাংলাদেশে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তবে এসব অর্থ কোনো বাংলাদেশি কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছিল বা তদন্তে প্রভাব ফেলেছিল—এমন প্রমাণ পাওয়ার কথা অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ জানায়নি।
আওলাদ বর্তমানে ব্রিসবেন পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করে তার আইনজীবী জানিয়েছেন, তার মক্কেল অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করবেন।
মামলার আসামিদের মধ্যে পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম জামিনে রয়েছেন। আমজাদ হোসাইন ও কবীর হোসাইন কারাগারে রয়েছেন। আওলাদকে বাংলাদেশের মামলায় পলাতক দেখানো হয়েছে।
রেহানার মেয়ে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে অস্ট্রেলিয়ায় তার বাবা-মায়ের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে রেহানার মা এজাহারে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে রেহানার নামে সম্পত্তি কেনা নিয়ে আওলাদের সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল।
অস্ট্রেলিয়াতেও আওলাদের বিরুদ্ধে রেহানার মৃত্যুসনদ জাল করার অভিযোগে মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় যৌথ মালিকানাধীন তিনটি সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে। তবে তার আইনজীবী ওই মৃত্যুসনদ জাল নয় বলে দাবি করেছেন। রেহানার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় পৃথক তদন্ত চলছে।