নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার আলোচনা দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সরকারের আমলে রাজনৈতিক বক্তব্য ও সরকারি ঘোষণায় বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও এ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বড় বিমানবন্দর ও অবকাঠামো নির্মাণ করলেই এভিয়েশন হাব গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য শক্তিশালী দেশীয় এয়ারলাইন্স, উন্নত যাত্রীসেবা, প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় এবং কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি এভিয়েশন হাব মূলত এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে বিভিন্ন দেশ ও গন্তব্য থেকে যাত্রী এসে একটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ পরিবর্তন করে অন্য গন্তব্যে যেতে পারেন। দুবাই, দোহা ও সিঙ্গাপুর এ ধরনের হাবের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর সীমিত অবস্থান। বর্তমানে দেশের চারটি এয়ারলাইন্সের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহন করছে। নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
এভিয়েশন খাতে দীর্ঘদিন কাজ করা উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলামের মতে, সরকার অবকাঠামো তৈরি করে দিতে পারে, কিন্তু হাব পরিচালনার মূল ভূমিকা পালন করতে হবে এয়ারলাইন্সগুলোকে। তার ভাষ্য, দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো এখন মূলত এক গন্তব্য থেকে আরেক গন্তব্যে যাত্রী পরিবহন করছে; হাব পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় মার্কেটিং কৌশল ও প্রস্তুতির দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক পরিচালক কাজী ওয়াহেদুল আলমও মনে করেন, শুধু আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ করলেই এভিয়েশন হাব তৈরি হবে না। তার মতে, এ জন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভিসা ব্যবস্থা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ, যাত্রীসেবা ও অন্যান্য নীতিগত বিষয়েও পরিবর্তন প্রয়োজন।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনও বলেছেন, এভিয়েশন হাবের জন্য বড় টার্মিনালের পাশাপাশি যাত্রীদের ট্রানজিট সময় কাটানোর মতো পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক ও সেবামূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তার মতে, শুধু অবকাঠামো তৈরি করে হাব গড়ে তোলা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ যাত্রীসেবা ও বাণিজ্যিক পরিবেশ।
তবে এভিয়েশন খাতের সাংবাদিক তানজীম আনোয়ারের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল যাত্রীসংখ্যার কারণে এভিয়েশন হাব তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, ঢাকা থেকে কয়েক ঘণ্টার উড়ান দূরত্বের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য রয়েছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক যাত্রী এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশে এভিয়েশন হাব তৈরির আলোচনা আগের সরকারের আমলেও ছিল। ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রোডম্যাপ তৈরির কথা বলেছিলেন। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিমানবন্দর ও এয়ারস্ট্রিপ উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অবকাঠামোর পাশাপাশি দেশীয় এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা, যাত্রীসেবা, বাণিজ্যিক কার্যকারিতা ও নীতিগত সংস্কারের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ফলে বাংলাদেশে এভিয়েশন হাব তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয়ে তারা একমত—শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা বা অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও শক্তিশালী এয়ারলাইনস কাঠামো গড়ে তোলাই হবে এ উদ্যোগের মূল চ্যালেঞ্জ।