নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের জাফনায় একটি গণকবর থেকে ৫৭২ জনের দেহাবশেষ উদ্ধারের পর কয়েক দশক ধরে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের মধ্যে শিশু ও নবজাতকের কঙ্কালও রয়েছে। তবে এগুলো কার মরদেহ, তা এখনো ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়নি।
চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশানের পরিধি বাড়ানোর জন্য খননকাজ চলার সময় গত ফেব্রুয়ারিতে মাটির নিচে মানবদেহের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। এরপর তদন্ত ও প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। আগস্টে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ হওয়ার পর মোট ৫৭২ জনের কঙ্কাল উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়।
কঙ্কালের পাশাপাশি চুড়ি, স্কুলব্যাগ, দুধের বোতলসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রীও পাওয়া গেছে। এ কারণে মানবাধিকারকর্মী ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে, এসব দেহাবশেষ শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের হতে পারে।
১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় চলা গৃহযুদ্ধে উত্তর ও পূর্বাঞ্চল ব্যাপক সংঘাতের শিকার হয়। তামিল বিদ্রোহী গোষ্ঠী এলটিটিই এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘ এই সংঘাতে বিপুল প্রাণহানি ঘটে। বিভিন্ন হিসাবে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, যাদের বড় অংশ তামিল জনগোষ্ঠীর।
চেম্মানি এলাকাটি নিয়ে এর আগেও গণকবরের অভিযোগ উঠেছিল। ১৯৯০-এর দশকে এক সেনাসদস্য আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে দাবি করেছিলেন, ওই এলাকায় কয়েক শ মানুষকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। পরে সেখানে খনন করে বেশ কিছু মানব কঙ্কালও উদ্ধার করা হয়।
নতুন করে ৫৭২টি কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো দ্রুত পরিচয় শনাক্ত ও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছে। জাফনার বাসিন্দা জেয়রুবি জয়পালানের বাবা কান্দাইয়া জয়পালান ১৯৯৬ সালে নিখোঁজ হন। পরিবারের অভিযোগ, চেম্মানি এলাকার একটি তল্লাশি চৌকি থেকে তাকে সেনাবাহিনী আটক করে নিয়ে যায়। এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
জেয়রুবির মতো আরও অনেক পরিবার কয়েক দশক ধরে নিখোঁজ স্বজনদের পরিণতি জানার অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হলে অন্তত কিছু পরিবারের সামনে সত্যটি পরিষ্কার হতে পারে।
তবে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলো বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগে আদালতের হেফাজতে সংরক্ষিত আছে। এখনো ডিএনএ পরীক্ষা শুরু হয়নি। প্রধান প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রাজ সোমদেব জানিয়েছেন, এ বিষয়ে একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন তৈরি করে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ আদালতে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দশকে ২০টির বেশি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে মান্নার এলাকায় পাওয়া একটি গণকবর থেকে ৩৫০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে এসব ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দেহাবশেষগুলোর সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং কোনো ঘটনাই এখন পর্যন্ত বিচারিক নিষ্পত্তিতে পৌঁছায়নি।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাই চেম্মানির তদন্তে স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয়, মৃত্যুর কারণ এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
শ্রীলঙ্কার সরকারগুলো অতীতের যুদ্ধকালীন ঘটনাবলিতে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান করে এলেও নতুন এই গণকবরের সন্ধানের পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য নির্ধারণে কার্যকর তদন্তের দাবি আবারও সামনে এসেছে।