নিউজ প্রবাসী ডেক্স :

লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় এখন সামনে। বুধবার বুয়েনস এইরেসের স্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামতে পারেন দেশটির ফুটবলের এই মহাতারকা। প্রিয় খেলোয়াড়কে শেষবার আকাশী-নীল-সাদা জার্সিতে দেখতে এরই মধ্যে আবেগে ভাসছেন আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা।

অথচ মেসির জাতীয় দলে পথচলার শুরুটা ছিল অনেকটাই অনিশ্চিত। বার্সেলোনার একাডেমিতে বেড়ে ওঠা এই তরুণকে একসময় আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্তাদেরই খুঁজে বের করতে হয়েছিল। এমনকি তাকে নিয়ে শুরুতে নামের বানান নিয়েও বিভ্রান্তিতে পড়েছিলেন কর্মকর্তারা।

২০০৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে মেসির প্রতিভার কথা আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিদের জানান তার বার্সেলোনা একাডেমির সতীর্থ সেস ফাব্রেগাস। এরপর মেসিকে জাতীয় দলের কাঠামোয় আনার উদ্যোগ শুরু হয়। ২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব-২০ দলে সুযোগ পান তিনি। পরের বছর যুব বিশ্বকাপে ছয় গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেন।

তবুও তখন মেসিকে পুরোপুরি আপন করে নেয়নি আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীরা। স্পেনে বেড়ে ওঠায় অনেকেই তাকে ‘বিদেশি’ হিসেবে দেখতেন। ২০০৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পরও সেই সংশয় পুরোপুরি কাটেনি। পরবর্তী সময়ে একের পর এক কৃতিত্ব অর্জন করেও দেশের জার্সিতে বড় শিরোপা এনে দিতে না পারার কারণে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।

২০১১ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে কঠিন সময়ে গোল করে দলকে জয় এনে দেওয়ার পর মেসিকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন সমর্থকেরা। তবে ২০১০ বিশ্বকাপের ব্যর্থতা এবং ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পরও তার ওপর প্রত্যাশার চাপ কমেনি।

২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। তার সেই সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মনোভাব বদলে দেয়। সমালোচনার বদলে শুরু হয় তাকে ফিরিয়ে আনার দাবি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলে ফিরে আসেন তিনি।

২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। এরপর দলের দায়িত্ব পান লিওনেল স্কালোনি। তার অধীনে মেসিকে ঘিরে নতুন আর্জেন্টিনার যাত্রা শুরু হয়।

২০২১ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। দেশের হয়ে প্রথম বড় ট্রফির স্বাদ পান মেসি। এরপর আসে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য—২০২২ কাতার বিশ্বকাপ।

সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পরও ঘুরে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠে। ফ্রান্সের বিপক্ষে নাটকীয় ফাইনালে নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় শেষে ৩-৩ সমতা ছিল। টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে জিতে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। মেসি জেতেন গোল্ডেন বলও।

২০২৪ কোপা আমেরিকায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে টানা তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপার সাফল্য পায় আর্জেন্টিনা—কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ ও আবার কোপা আমেরিকা। এর মধ্য দিয়ে মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বড় অপূর্ণতাগুলোও পূর্ণতা পায়।

বয়স বাড়লেও ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন মেসি। আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠে। একের পর এক ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালেও জায়গা করে নেয়। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় দলটি।

কিন্তু ১৯ জুলাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ফেররান তোরেসের একমাত্র গোলে শিরোপা জিতে নেয় স্পেন। বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর মেসির চোখে যেমন পানি ছিল, তেমনি কেঁদেছেন তার ভক্তরাও।

ফাইনালের পর জাতীয় দলের হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করা মেসির বিদায়ের ছবিটা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। এখন বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি হয়ে উঠেছে সেই বিদায়ের আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত।

একসময় যাকে আর্জেন্টিনার অনেকেই ‘বিদেশি’ মনে করতেন, সেই মেসিই আজ দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় নায়ক। তার বিদায়ে তাই বেদনার পাশাপাশি থাকবে গর্বও। কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ ও অসংখ্য স্মৃতি দিয়ে সমৃদ্ধ মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের শেষটা হতে যাচ্ছে আবেগঘন এক মুহূর্তে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts