নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
চাঁদাবাজি-হামলার ঘটনায় বারবার নাম, অনুসারীদের কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও দেশে ফেরানোর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়
ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’কে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বলছে, বিদেশে অবস্থান করেও অনুসারীদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের কাছে চাঁদা দাবি, বাড়িতে গুলি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার কয়েকটি ঘটনায় বড় সাজ্জাদের নাম সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় তার অনুসারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, সাজ্জাদ নিজের পরিচয় গোপন করে বিদেশে অবস্থান করছেন। পুলিশ বলছে, ইন্টারপোলে ‘সাজ্জাদ হোসেন খান’ নামে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের পর ২০১২ সালে ওই নোটিস জারি করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রেড নোটিস জারির পর ২০১৩ সালে ভারত থেকে দুবাই যাওয়ার পথে সাজ্জাদ আটক হয়েছিলেন। বিষয়টি বাংলাদেশ পুলিশকে জানানো হলেও তাকে দেশে ফেরাতে সে সময় কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পরে ভারতের কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে যান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, বর্তমানে ভারতে ‘মো. আব্দুল্লাহ’ নামে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন সাজ্জাদ। ওই পাসপোর্টে বাবা-মায়ের নাম ও ঠিকানাতেও ভিন্ন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অপরাধ জগতে উত্থান
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার চালিতাতলী থেকে সাজ্জাদের নাম আলোচনায় আসে। সে সময় বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় তার নাম জড়ায়। ১৯৯৯ সালে পাঁচলাইশের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান হত্যাকাণ্ডেও তার নাম আসে। তবে সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় তিনি খালাস পান।
২০০০ সালে চট্টগ্রামে আট ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী হত্যার মামলায় বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতে তিনি খালাস পান। একই বছর একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে বিদেশে চলে যান বলে জানা যায়।
পরবর্তীতে ২০১২ সালে তাকে দেশে ফেরাতে ইন্টারপোলের সহায়তা চায় চট্টগ্রাম নগর পুলিশ। এরপরই তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি হয়।
নগরজুড়ে ছড়িয়েছে চাঁদাবাজির অভিযোগ
পুলিশের ভাষ্য, একসময় বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকা বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের তৎপরতা এখন চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
চাঁদাবাজির আগে ব্যবসায়ী ও ভবন নির্মাণকারীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই তথ্য বড় সাজ্জাদের কাছে পাঠানো হয়। তার নির্দেশ পাওয়ার পর সহযোগীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন করে চাঁদা দাবি করেন বলে পুলিশের দাবি।
চাঁদা না দিলে গুলি, হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটানোর অভিযোগও রয়েছে। পুলিশের দাবি, আদায় করা অর্থ পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে বড় সাজ্জাদের কাছে পাঠানো হয়।
সম্প্রতি চাঁদা না পেয়ে বাঁশখালীর সাবেক সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের বাসায় গুলি চালানোর ঘটনায় তার অনুসারীদের নাম আসে। এছাড়া বাকলিয়া এক্সেস রোডের একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে দুই কোটি টাকা এককালীন এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে।
ধরা পড়েছে কয়েক সহযোগী
বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছোট সাজ্জাদকে গত ১৫ মার্চ ঢাকায় গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ। ডেভিড ইমনকে ভারতে পালানোর চেষ্টার সময় ২৬ জুলাই যশোর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর ২৮ আগস্ট পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির পর ফটিকছড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন মোবারক ওরফে গলাকাটা মোবারক।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ছোট সাজ্জাদ, রায়হান, ডেভিড ইমন ও মোবারকসহ কয়েকজনকে বিদেশে বসে বড় সাজ্জাদ নিয়ন্ত্রণ করেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। তাদের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের পর চাঁদার অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয় বলেও তিনি জানান।
রাজনৈতিক কোনো পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে পুলিশ সুপার বলেন, অভিযুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি থাকলেও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আরও তদন্ত করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts