নিজস্ব প্রতিবেদক
ছয় মাসের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে সুন্দরবনে ফিরেছে শিকারিদের ফাঁদে আহত হওয়া একটি বাঘিনী। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার আহত একটি বাঘকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর সফলভাবে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—একটি বাঘিনীকে সুস্থ করে বনে ফেরানো গেলেও সুন্দরবনের বাঘের সামগ্রিক নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত হয়নি। হরিণ শিকার, বিষটোপ দিয়ে মাছ ধরা, চোরাশিকার, বনদস্যুদের তৎপরতা এবং আবাসস্থলের ওপর বাড়তে থাকা চাপ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বড় হুমকি হয়ে রয়েছে।
গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন এলাকায় হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি আহত হয়। পরদিন ট্রাঙ্কুইলাইজার গান দিয়ে অচেতন করে ফাঁদ কেটে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নিয়ে ছয় মাস চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
চিকিৎসার পর গত ১২ জুলাই সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে তাকে অবমুক্ত করা হয়। প্রায় ৯ থেকে ১০ বছর বয়সী এই বাঘিনীটির দৈর্ঘ্য প্রায় আট ফুট।
বনে ফেরার আগে পরীক্ষা
বাঘ গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ জানান, অবমুক্তির আগে বাঘিনীটির শারীরিক সক্ষমতা, আচরণ ও শিকারের দক্ষতা পরীক্ষা করা হয়।
পুনর্বাসনকেন্দ্রে প্রথম দিকে তাকে মাংস খাওয়ানো হলেও শেষ দেড় মাস জীবন্ত ছাগল ও বুনো শূকর দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে তার স্বাভাবিক শিকারি প্রবৃত্তি ও শিকারের কৌশল ফিরেছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
অধ্যাপক আজিজের মতে, অবমুক্তির পর বাঘিনীকে কিছুটা ধীরগতিতে হাঁটতে দেখা গেলেও এতে শারীরিক অসুস্থতার প্রমাণ নেই। দীর্ঘ সড়ক ও নৌপথের যাত্রা, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, মানুষের ভিড় এবং ড্রোনের শব্দ এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্যামেরায় নজরদারি
বাঘিনীটিকে উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের একটি বনাঞ্চলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তার চলাফেরা পর্যবেক্ষণে ওই এলাকায় ১৯টি ইনফ্রারেড ক্যামেরা বসানো হয়েছে। উদ্ধারস্থলের আশপাশেও বসানো হয়েছে আরও একটি ক্যামেরা।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বাঘিনীটি নিরাপদ পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে। কয়েক সপ্তাহের ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে তার অবস্থান ও আচরণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
বাঘ ফিরলেও শিকার বন্ধ হয়নি
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আহত বাঘিনীকে চিকিৎসা দিয়ে বনে ফিরিয়ে দেওয়া দেশের সংরক্ষণ সক্ষমতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে বাঘের খাবার ও আবাসস্থল নিরাপদ না হলে এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়।
পরিবেশবাদীদের মতে, হরিণ শিকার অব্যাহত থাকায় বাঘের প্রধান খাদ্যের সংকট তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি বিষটোপ দিয়ে মাছ ধরার কারণে সুন্দরবনের খাদ্যচক্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) মোংলা অঞ্চলের সংগঠক নূর আলম শেখ বলেন, একটি বাঘকে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করে সুস্থ করে বনে ফেরানো হয়েছে ঠিকই; কিন্তু যে কারণে বাঘটি ফাঁদে পড়েছিল, সেই হরিণ শিকার বন্ধ না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তিন বছরে দেড় হাজার কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে সুন্দরবনে চোরাশিকার দমনে অভিযান চালিয়ে প্রায় দেড় হাজার কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে ৯৬টি মামলা হয়েছে এবং আসামি করা হয়েছে ২০৪ জনকে। তাদের মধ্যে ১৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত এক বছরে এক লাখ ১৪ হাজার ফুটের বেশি মালা ফাঁদ, ৮১৩টি ছিটকা ফাঁদ এবং প্রায় আড়াই হাজার হাঁটা ফাঁদ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ।
সুন্দরবনে এখন ১২৫ বাঘ
বন বিভাগের সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি বাঘ রয়েছে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০৬ এবং ২০১৮ সালে ১১৪টি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের পাগমার্ক পদ্ধতিতে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণের তুলনায় ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতির তথ্য বেশি নির্ভরযোগ্য। তবে একসময় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে ধারণা পাওয়া যায়।
নতুন চ্যালেঞ্জ জলবায়ু ও পরিবেশের চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, চোরাশিকারের পাশাপাশি পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিবেশও সুন্দরবনের বাঘের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বনের প্রতিবেশব্যবস্থা, খাদ্যচক্র ও আবাসস্থল সুরক্ষিত না থাকলে বাঘের সংখ্যা ধরে রাখা কঠিন হবে।
তাদের মতে, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, বন বিভাগের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়, চোরাশিকার বন্ধ এবং বনজীবীদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।