নিউজ প্রবাসী ডেক্স:

পাঁচ হাজার টনেরও বেশি ওজন, উচ্চতা ৪০৭ ফুট—আকার ও শক্তির দিক থেকে মহাকাশযানের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্পেসএক্সের স্টারশিপ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রকেট হিসেবে পরিচিত এই মহাকাশযানটির সফল উৎক্ষেপণের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী ইঞ্জিন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং একাধিক ধাপে সাজানো প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা।

স্টারশিপের দুটি অংশ একত্র করলে এর উচ্চতা দাঁড়ায় ৪০৭ ফুট। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু গাছ ‘হাইপেরিয়ন’-এর চেয়েও উঁচু এই রকেটটি স্ট্যাচু অব লিবার্টির তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি উঁচু। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎক্ষেপণের সময় রকেটটির সর্বোচ্চ থ্রাস্ট বা ধাক্কা দেওয়ার ক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড-ফোর্স।

২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রথম পূর্ণাঙ্গ উৎক্ষেপণের সময় রকেটটির বুস্টার থেকে নির্গত প্রচণ্ড তাপে উৎক্ষেপণ প্যাডের কংক্রিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ভূগর্ভস্থ মাটিও সরে যায় এবং প্রায় ৩৮৫ একর এলাকাজুড়ে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় বুস্টারের থ্রাস্ট ছিল ১ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড-ফোর্স, যা পরবর্তী সময়ে উৎক্ষেপিত সংস্করণের তুলনায় কিছুটা কম।

দুই অংশে গঠিত বিশাল রকেট

স্টারশিপ মূলত দুটি অংশ নিয়ে তৈরি। নিচের অংশটির নাম ‘সুপার হেভি’। ২৩৬ দশমিক ২ ফুট দীর্ঘ এই বুস্টার উৎক্ষেপণের সময় রকেটটিকে প্রাথমিক ধাক্কা দিয়ে আকাশে তুলে নেয়।

এর ওপরের অংশটি ১৭০ দশমিক ৬ ফুট দীর্ঘ স্টারশিপ মহাকাশযান। স্পেসএক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা দিয়ে বড় আকারের পণ্য, ভবিষ্যতে মানুষ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে পরিবহন করা সম্ভব হবে। রকেটের দুটি অংশই পুনরুদ্ধার করে বারবার ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

৩৩টি ইঞ্জিনে বিপুল শক্তি

সুপার হেভি বুস্টারে রয়েছে ৩৩টি র‍্যাপ্টর ইঞ্জিন। তরল মিথেন ও তরল অক্সিজেন পুড়িয়ে এসব ইঞ্জিন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড-ফোর্স থ্রাস্ট তৈরি করে।

তুলনামূলকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেট সর্বোচ্চ ৮৮ লাখ থেকে ৯৪ লাখ পাউন্ড-ফোর্স থ্রাস্ট উৎপন্ন করতে পারে। সুপার হেভি বুস্টার আলাদা হয়ে যাওয়ার পর স্টারশিপের যাত্রা অব্যাহত থাকে ছয়টি ইঞ্জিনের সাহায্যে। এর মধ্যে তিনটি সাধারণ র‍্যাপ্টর এবং তিনটি মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী র‍্যাপ্টর ভ্যাকিউম ইঞ্জিন।

স্পেসএক্সের তথ্য অনুযায়ী, ওপরের অংশটির থ্রাস্ট প্রায় ৩৫ লাখ পাউন্ড-ফোর্স। তবে উৎক্ষেপণের সময় মূল থ্রাস্ট হিসেবে বুস্টারের শক্তিকেই বিবেচনা করা হয়।

জ্বালানি ধারণক্ষমতাও বিশাল

ভারী বোঝা নিয়ে মহাকাশে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে শুধু মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রম করাই বড় চ্যালেঞ্জ নয়; প্রয়োজন বিপুল জ্বালানিও। সুপার হেভি বুস্টারে প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন জ্বালানি ধারণ করা যায়। অন্যদিকে, স্টারশিপের ওপরের অংশে ধারণক্ষমতা রয়েছে আরও ১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন।

সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থায় জ্বালানি ধারণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন। এত বিপুল ওজন নিয়েও মহাকাশে পৌঁছাতে রকেটটির প্রতিটি ধাপের বিন্যাস, ইঞ্জিনের কার্যকারিতা এবং উৎক্ষেপণের আগের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চাঁদে যেতে কক্ষপথেই নিতে হবে জ্বালানি

স্টারশিপের সক্ষমতা ব্যাপক হলেও নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, চাঁদে নভোচারী পাঠানোর অভিযানে এটি সরাসরি পৃথিবী থেকে চাঁদে যেতে পারবে না। চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণের জন্য তৈরি স্টারশিপ ল্যান্ডারকে পৃথিবীর কক্ষপথে পুনরায় জ্বালানি নিতে হবে।

এ জন্য স্পেসএক্স ও নাসা একটি বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করেছে। প্রথমে মহাকাশে পাঠানো হবে ‘প্রপেল্যান্ট ডিপো’ বা জ্বালানি সংরক্ষণাগার। এরপর একাধিক ট্যাংকার স্টারশিপ সেখানে গিয়ে জ্বালানি সরবরাহ করবে। সবশেষে চাঁদের ল্যান্ডার উৎক্ষেপণ করে ওই ডিপোর সঙ্গে যুক্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি নেওয়া হবে।

নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির আওতায় নভোচারীরা ওরিয়ন মহাকাশযানে যাত্রা শুরুর আগেই জ্বালানি সরবরাহের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর পৃথিবীর কক্ষপথে প্রস্তুত রাখা স্টারশিপ ল্যান্ডারের সঙ্গে নভোচারীরা যুক্ত হবেন। স্টারশিপ তাঁদের চাঁদের কক্ষপথে নিয়ে যাবে। পরে ল্যান্ডারটি দুই নভোচারীকে চাঁদের পৃষ্ঠে নামাবে এবং সেখান থেকে ফিরিয়ে আনবে।

তবে মহাকাশের চরম ঠাণ্ডা পরিবেশে জ্বালানি সংরক্ষণ এবং এক মহাকাশযান থেকে অন্যটিতে স্থানান্তর করা অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তিগত কাজ। এ কারণে পুরো অভিযানে নির্ধারিত ধাপ অনুসরণ, পুনরায় জ্বালানি সরবরাহ এবং সহায়ক ব্যবস্থাগুলো সচল রাখা জরুরি।

বিশাল আকার, শক্তিশালী ইঞ্জিন ও পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে স্টারশিপকে ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে গড়ে তুলতে চায় স্পেসএক্স। তবে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জ্বালানি স্থানান্তরসহ বেশ কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts