নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
লিওনেল মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনার মানুষের আবেগের গল্পটা ছিল দীর্ঘ এবং নানা বাঁকে ভরা। একসময় যে ফুটবলারকে জাতীয় দলে নেওয়া নিয়েই আর্জেন্টাইনদের একটি অংশের আপত্তি ছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই মেসিই হয়ে উঠেছেন দেশটির ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতীক। এবার সেই মহাতারকার জাতীয় দল থেকে বিদায়ের পালা।
বুধবার বুয়েনস এইরেসের স্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামতে পারেন মেসি। প্রিয় তারকাকে আকাশী-নীল জার্সিতে শেষবার দেখার অপেক্ষায় এরই মধ্যে আবেগে ভাসছেন সমর্থকেরা।
তবে মেসির আন্তর্জাতিক পথচলার শুরুটা এতটা উষ্ণ ছিল না। বার্সেলোনার একাডেমিতে বেড়ে ওঠা এই তরুণকে আর্জেন্টিনার ফুটবল অঙ্গন প্রথমদিকে ঠিকমতো চিনতেই পারেনি। এমনকি তাকে জাতীয় দলে খুঁজে বের করার সময়ও নাম নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছিলেন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা। কোথাও ‘লিওনেল’-এর বদলে ‘লিওনার্দো’, আবার কোথাও ‘মেসি’র বদলে ‘মেচি’ নামে খোঁজা হয়েছিল তাকে।
২০০৪ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দলে অভিষেক হয় মেসির। পরের বছর যুব বিশ্বকাপে শুরুতে বেঞ্চে থাকলেও পরে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন। ছয় গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেন।
জাতীয় দলে অভিষেকের পরও মেসিকে দীর্ঘদিন পুরোপুরি আপন করে নিতে পারেনি আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা। ২০০৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম বয়সে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে খেলা ও গোল করার কৃতিত্ব, ২০০৮ অলিম্পিকে সোনা জয়—সবকিছুর পরও দেশের জার্সিতে তার পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
২০১১ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে কঠিন সময়ে গোল করে দলকে জেতানোর পর মেসিকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন সমর্থকেরা। তবে ২০১০ বিশ্বকাপের ব্যর্থতা এবং ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার তার ওপর প্রত্যাশার চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। সেই সিদ্ধান্তই যেন আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে তার সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সমালোচনার বদলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলে ফেরেন তিনি।
২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিলেও পরবর্তী সময়ে মেসি-স্কালোনি যুগে বদলে যায় দলটির চিত্র। ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছর পর মহাদেশীয় শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। সেই আসরেই জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় শিরোপার স্বাদ পান মেসি।
এরপর আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের হতাশা কাটিয়ে আর্জেন্টিনা একের পর এক বাধা পেরিয়ে ফাইনালে ওঠে। ফ্রান্সের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ফাইনালে নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় শেষে ৩-৩ সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ হাতে তোলেন মেসি। জেতেন গোল্ডেন বলও।
২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও শিরোপা ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ ও আবার কোপা আমেরিকা—টানা তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপার সাফল্যে মেসির ক্যারিয়ারের অপূর্ণতার বড় অংশই পূর্ণ হয়।
বয়স বাড়লেও ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য জাতীয় দলের সঙ্গে পথচলা চালিয়ে যান মেসি। আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠে এবং একের পর এক ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালেও পৌঁছে। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে দলটি।
তবে ১৯ জুলাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে আর্জেন্টিনা নিজেদের সেরাটা দেখাতে পারেনি। ফেররান তোরেসের একমাত্র গোলে শিরোপা জিতে নেয় স্পেন। বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর মেসির চোখে যেমন ছিল অশ্রু, তেমনি কেঁদেছেন আর্জেন্টাইন সমর্থকেরাও।
ফাইনালের পর জাতীয় দলের হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করা মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। এখন বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি হয়ে উঠেছে সেই বিদায়ের আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত।
একসময় যে খেলোয়াড়কে ‘বিদেশি’ বলে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল, সেই মেসিই আজ আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়ক। বিদায়ের মুহূর্তে তাই একদিকে থাকবে প্রিয় তারকাকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে থাকবে তার হাত ধরে পাওয়া কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ ও আরও অসংখ্য স্মৃতির গর্ব।