নিউজ প্রবাসী ডেক্স:

বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৩৫ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয়ের পরিমাণ ছিল ৩০০ কোটি ডলার।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে।

সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধির হার বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভোক্তাদের পরিবর্তিত চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও এ প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বাসসকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ প্রবৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর ভাষ্য, বড় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ এ বাজারে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রপ্তানি খাতের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক।

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা সময়মতো পণ্য সরবরাহ, গুণগত মান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণের মাধ্যমে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রেখেছেন।

বিকল্প বাজারেও বাড়ছে রপ্তানি

প্রচলিত বড় বাজারের পাশাপাশি নতুন ও বিকল্প গন্তব্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও কয়েকটি অপ্রচলিত বাজারে প্রবৃদ্ধি রপ্তানি বাণিজ্যের পরিধি বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বড় বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্কে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি—৮২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এ সময়ে দেশটিতে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ১৫ কোটি ৯৯ লাখ ২০ হাজার ডলার।

এ ছাড়া সৌদি আরবের বাজারে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ইউরোপের স্পেনেও দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

হাসান আরিফের মতে, মধ্যপ্রাচ্যসহ উদীয়মান কয়েকটি বাজারে রপ্তানি বাড়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক গন্তব্যের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। এতে কয়েকটি বড় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

যুক্তরাজ্য ও জার্মানি দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে

যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় গন্তব্য যুক্তরাজ্য ও জার্মানি। জুলাই-অক্টোবর সময়ে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৭৪ কোটি ডলার। এর মধ্য দিয়ে দেশটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজারের অবস্থান ধরে রেখেছে।

একই সময়ে জার্মানিতে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৫৭ কোটি ডলার। দেশটি রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। এরপর রয়েছে স্পেন ও নেদারল্যান্ডস।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো বড় বাজারগুলো বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জোগান দিচ্ছে। তাই এসব বাজারে অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন গন্তব্য অনুসন্ধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আয় ৭৫ কোটি ডলার

চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের শুরুতেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৭৫ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই মাসে এ আয় ছিল ৬৭ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।

অক্টোবরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯৯ কোটি ডলার। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এ আয় ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এতে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখা এবং রপ্তানি আয় বাড়াতে সহায়তা হচ্ছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার বা তা এড়ানোর সুযোগ নিয়ে বিজিএমইএ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়ার বিষয়ে তারা আশাবাদী।

প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বহুমুখীকরণের তাগিদ

বিশ্ববাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাজার ও পণ্যের বহুমুখীকরণ, গুণগত মান উন্নয়ন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় বাজারগুলোতে অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ালে রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা ও ভোক্তাদের পছন্দ অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

ইপিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান আরিফ বলেন, প্রচলিত বড় বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়ার কারণে আগামী মাসগুলোতেও রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা বজায় থাকবে বলে তাঁরা আশাবাদী।

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে মোট পণ্য রপ্তানি আয় ১ হাজার ৭০৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তুরস্ক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বাজারে রপ্তানি বাড়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ভিত্তি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts